নিজস্ব প্রতিবেদক | সর্বশেষ আপডেট: শনিবার, 11th মে, 2019

উন্নয়নের পথে ধর্ষণ বোনাস!

Share This
Tags
Print Friendly

Screen Shot 2019-05-11 at 10.21.06ধর্ষণ, ধর্ষক, ধর্ষণের শিকার কিংবা ধর্ষিতা! শব্দগুলো শুনলে এখন কি আর আগের মতো আঁতকে উঠি আমরা? জানি, উত্তরটি হবে ‘না’। ভয়ংকর এই শব্দগুলো শুনতে শুনতে আর এ ধরনের খবর পড়তে পড়তে আমাদের কানের পর্দা শক্ত হয়ে গেছে। আমাদের চোখের পর্দা পুরু হয়ে গেছে। সংবাদপত্র হাতে নিলে একটি দিনও বাদ যায় না, যেদিন ধর্ষণের খবর প্রকাশিত হয় না। আমরা ধর্ষণের ঘটনায় এতটাই অভ্যস্ত হয়ে গেছি যে এই ঘৃণ্য অপরাধের কথা শুনলে এখন আমরা অনেকেই আর বিচলিত হই না। আর বিচলিত হয়ে লাভটাই-বা কী?

উন্নয়নের মহাসড়কে তীব্র গতিতে ছুটে চলা বাংলাদেশে প্রতিবছর হাজার হাজার নারী আর কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। এই তো চলতি মাসেরই প্রথম আট দিনে সারা বাংলাদেশে ৪১টি শিশু ধর্ষণ ও ৩টি শিশু ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন প্রকাশিত এই বিশ্লেষণ অনুযায়ী এই ৪১ শিশুর মধ্যে ৪টি ছেলেশিশুও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এদের মধ্যে মারা গেছে ৩টি মেয়েশিশু। মৃত্যু কত সুলভ এ দেশে!

আর ধর্ষণ যেন এক মামুলি অপরাধ! ধর্ষণ যেন নষ্ট হয়ে যাওয়া ক্ষুধার্ত পুরুষের একধরনের বিলাসী আহার! এদের থামানোর কেউ নেই। কুকুরেরও ভাদ্র মাস ফুরোয়, কিন্তু ভাদ্র মাস কখনো শেষ হয় না মানুষরূপী ওই জানোয়ারগুলোর। ভয় হয়, কোনো দিন ওদের সর্বগ্রাসী ক্ষুধা গ্রাস করবে সমগ্র বাংলাদেশকে। বাংলাদেশ কি অচিরেই বিশ্বের বুকে পরিচিত হতে যাচ্ছে ‘ধর্ষণের দেশ’ হিসেবে। কেউ কি ভেবে দেখেছেন? সেই দিন হয়তো খুব বেশি দূরে নেই।

কদিন আগে শাহিনুর আক্তারকে চলন্ত বাসে গণধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। শাহিনুর আক্তার পেশায় একজন নার্স ছিলেন। অসুস্থ মানুষকে সেবা দিয়ে সুস্থ করে তোলাই ছিল তাঁর পেশা। তিনি কাজ করতেন ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে। শাহিনুরের মুখটা কেন জানি খুব পরিচিত লাগে আমার। শাহিনুর যে হাসপাতালে কাজ করতেন, সেই হাসপাতালে বেশ কিছুদিন আগে চিকিৎসাধীন ছিলেন আমার বাবা। চিকিৎসকদের পেশাদারি আর হাসপাতালটির নার্সদের নিরবচ্ছিন্ন সেবা আমার বাবাকে দ্রুত সুস্থ করে তুলেছিল। কে জানে শাহিনুরও হয়তো সেই নার্সদের মধ্যে একজন ছিলেন! মৃত্যুপথযাত্রী কত রোগীকে মৃত্যুমুখ থেকে প্রতিনিয়ত ফিরিয়ে নিয়ে আসেন শাহিনুরেরা। প্রতিদানে এই সমাজে ওত পেতে থাকা নরকের কীটরা তাঁদের ধর্ষণ করে। শুধু ধর্ষণ করেই তারা ক্ষান্ত হয় না, তারা শাহিনুরদের মাথা থেঁতলে দেয়, তারপর পৈশাচিক উল্লাসে ধর্ষণের শিকার দেহ ছুড়ে ফেলে ঝোপ-জঙ্গলে কিংবা মহাসড়কের ঢালে। রূপাকেও ওরা তা-ই করেছিল। রূপার ধর্ষণের শিকার, থেঁতলানো দেহটিও পাওয়া গিয়েছিল শালবনের নিকষ কালো অন্ধকারে। শাহিনুর যখন ধর্ষণের শিকার হচ্ছিলেন চলন্ত বাসে, যখন মেয়েটা একটু একটু করে মারা যাচ্ছিলেন, তখন তিনি নিশ্চয়ই নিজেকে প্রশ্ন করেছিলেন, কী তাঁর অপরাধ? সমাজকে সেবা করার বিনিময়ে তিনি কী পেলেন? তাঁর বিপদে কেউ কি এগিয়ে আসবে? কেউ কি বাঁচাবে তাঁকে?

শাহিনুরের এই প্রশ্নগুলো চলন্ত বাসের চার দেয়ালে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এসেছে। কেউ এগিয়ে আসেনি শাহিনুরকে বাঁচাতে। শাহিনুরকে গণধর্ষণ করা হয়েছে। ‘গণ’ শব্দটি সম্মিলিত শক্তির অস্তিত্বকেই জানান দেয়। গণ-আন্দোলন, গণ-অভ্যুত্থান, গণসংযোগ, গণসংগীত, গণনাটক—এই শব্দগুলো শুনলে মনের মধ্যে একধরনের উদ্দীপনা অনুভব করি। চোখের সামনে ভেসে ওঠে একাত্তর, উনসত্তর, নব্বই কিংবা শহীদ মিনারের বেদিতে জাগ্রত জনতার সম্মিলিত স্লোগান, গান কিংবা নাটকের মঞ্চায়ন। কিন্তু এই শব্দটিই কদাকার ও ঘৃণ্য হয়ে ওঠে, যখন তা ‘ধর্ষণ’ শব্দটির সঙ্গে যুক্ত হয়। একদল ক্ষুধার্ত পুরুষ আদিম উল্লাসে সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণ করছে কোনো এক নারীকে—দৃশ্যটি ভাবলেই বুকের ভেতরটা উথাল–পাতাল করে, দম আটকে আসে, তীব্র কষ্ট হয়, চোখ ভিজে যায় জলে।

কোথায় গেলে একটু নিরাপত্তা পাবেন নারীরা? নিজের ঘরে, রাস্তাঘাটে, স্কুল-কলেজে, মাদ্রাসায়, বিশ্ববিদ্যালয়ে, গণপরিবহনে, রাইড শেয়ারে, কর্মস্থলে, হাসপাতালে, একুশের প্রভাতফেরিতে, নাকি মঙ্গল শোভাযাত্রায়? কোথাও একটু শান্তি নেই, নিরাপত্তা নেই এতটুকু। আজকাল লিফটেও একা চড়তে ভয় হয়। ভয় হয় ফ্যাশান হাউসের ট্রায়াল রুমে ঢুকতে কিংবা অচেনা প্রক্ষালন কক্ষে। গণপরিবহনে তো বটেই; ব্যক্তিগত গাড়িতেও একা ড্রাইভারের সঙ্গে চলতে ভয় হয়। প্রকাশ্য দিবালোকে জনসমক্ষেই যে দেশে নারীরা নিগৃহীত হন, সে দেশে কোনো মেয়ে রাতের আঁধারে একা চললে ধর্ষণের শিকার হবেন, এটাই যেন স্বাভাবিক। সর্বদাই ধর্ষণের শিকার আর অপমানিত হওয়ার ভয় কুরে কুরে খায় নারীদের। বিচারহীনতাই যে দেশের সংস্কৃতি, সেখানে বিচার চাওয়াও যেন একধরনের অপরাধ। নুসরাত সেই অপরাধেরই মাশুল দিয়েছেন নিজের জীবন দিয়ে। এ দেশে দুই–তৃতীয়াংশ নারী পারিবারিক নির্যাতনের শিকার, ৯৪ শতাংশ নারী গণপরিবহনে আর ৪০ শতাংশ নারী পোশাকশ্রমিক কারখানার ভেতরে বাইরে যৌন হয়রানির শিকার হন। এখানে সহিংসতার শিকার প্রায় ৯৭ শতাংশ ভুক্তভোগীর অভিযোগ আদালতে শুনানির পর্যায়ে যায় না বা গেলেও বাতিল হয়ে যায়। মজার ব্যাপার হলো এ দেশের অধিকাংশ নারী ও পুরুষ এখনো জানেন না যৌন নির্যাতনের সঠিক সংজ্ঞা। সংজ্ঞাটি জানলে যৌন সহিংসতার শিকার বলে গণ্য হওয়া নারীর সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়ে যাবে, আমি নিশ্চিত।

প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪০ জন নারী কিংবা কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হচ্ছে এই দেশে। ছেলেশিশুরাও বলাৎকারের শিকার হচ্ছে। ধর্ষণের এই ধারা অব্যাহত থাকলে ধর্ষকদের নিজেদের ঘর সুরক্ষিত থাকবে তো! হয়তো তাতে কিছুই আসে–যায় না এই কাপুরুষদের। কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্রের কর্মকর্তারা, আপনারা সাবধান! আর কতকাল হাত গুটিয়ে বসে থাকবেন! এবার গা ঝাড়া দিয়ে জেগে উঠুন। হারকিউলিস বা এ ধরনের নাম দিয়ে রাতের আঁধারে এই ধর্ষকদের মারার অভিযানে নামবেন না; বরং সবার সামনে আইনের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই নরপশুগুলোর বিচারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করুন। নিজেদের মোটেই নিরাপদ বলে মনে করবেন না। এই নেকড়েদের ক্ষুধার্ত দৃষ্টি থেকে রেহাই পাবে না আপনার ঘরের নারী কিংবা কন্যাশিশুটিও। প্রতিমুহূর্তে নারীর প্রতি সহিংসতা, নির্যাতন আর ধর্ষণের দায় নিয়ে কখনো কি ওঠা যায় উন্নয়নের মহাসড়কে?

নিশাত সুলতানা: লেখক ও গবেষক
purba_du@yahoo.com