নিজস্ব প্রতিবেদক | সর্বশেষ আপডেট: সোমবার, 17th নভে., 2014

অবিশ্বাস্য সৌন্দর্যের জাঁদী পাই ঝর্না

Share This
Tags
Print Friendly

মোঃ জাভেদ বিন-এ -হাকিম।।
পরিকল্পনা ছিল এবার ভারতের চেরাপুঞ্চী যাব। পাসপোর্ট ডেলিভারী তারিখের দিন রাতের বাসেই চলে যাব ,সেই চিন্তা থেকেই বাড়ি থেকে প্রয়োজনিয় রসদের ঝোলা নিয়ে বের হই।ভিসা না পাওয়ার কারনে, শেষ মুহুর্তে সব ভেস্তে যায় । কিঞ্চিত মনোঃকষ্ট নিয়ে সোজা সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে। হায় খোদা বাসের টিকেটও নেই। অতঃপর টামিনাল এলাকার বন্ধুর দারস্ত হই। টিকেট পেলাম মাত্র দুটি। কি আর করা, ভ্রমনে আমার সাথে সবচেয়ে বেশি যার সাথে খুনসুটি হয় সেই দোস্তকে সঙ্গে করে যাত্রা শুরু।ভোর চারটা পঁচিশ মিনিটে বান্দরবান পৌছাই। গন্তব্য জাঁদিপাই ঝর্না। চান্দের গাড়িতে সোজা ক্যইক্ষংঝিড়ী। তারপর ট্রলারে চেপে সাঙ্গু নদের হিমেল হাওয়া গায়ে মেখে রুমা বাজারে এসে পৌছাই।
দক্ষ গাইড মোঃ নূরুল ইসলাম-কে আমাদের সাথে নেই। হাতে সময় থাকায় সেদিনই আর্মি ক্যাম্পে নাম ঠিকানা এন্ট্রি করে চান্দের গাড়িতে রওনা হই। পাহাড়ী সর্পিল পথে গাড়ি হেলে দুলে প্রায় দুই ঘন্টা পর পর্যটকদের নামিয়ে দেয় কমলা বাজার। এবার শুরু হল বাঁশের লাঠি হাতে নিয়ে উচু-নীচু পাহাড় বেঁয়ে বগালেক পানে। কখনো গভীর গিরি খাতে কখনো বি¯তৃত নীলিমার দিকে কখনোবা আবার ঢেউ তোলা পাহাড়ের সবুজ গালিচায় চোখ বুলাতে বুলাতে ঘন্টাখানেক হাটার পরেই পৌছে যাই দেশের সর্ব্বোচ্চ উচুতে অবস্থিত প্রকৃতির অপার দান বগা লেক। সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে এর উচ্চতা দুই হাজার সাতশত ফিট। আর্মি ক্যাম্প হতেই এর সৌন্দর্য দেখে মনের ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। আর দেহের ক্লান্তি স্বচ্ছ টলটলে জলে ডুব দিতেই এক নিমিষে দূর। দীর্ঘক্ষণ সাতার কাটলেও মন ভরবে না। বম যুবক মিঃ কিম হতে জানা গেল বগালেক নিয়ে যে পৌরানিক কাহিনী প্রচলিত আছে তার কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। সুতরাং মন ভরে ডুব সাতারে মাতিয়ে রাখুন নিজেকে। আদিবাসীদের রেষ্টুরেন্টে দুপুরের খাবার সেরে আবারও হাটা শুরু হল কেওক্রাডং পাহাড়ের উদ্দেশ্যে। জাঁদিপাই ঝরনায় যেতে হলে কেওক্রাডং গেষ্ট হাউজে রাত্রি যাপন করতে হবে। সমুদ্র পৃষ্ঠ হতে দেশের দ্বিতীয় উচুতম পাহাড় কেওক্রাডং এর উচ্চতা তিন হাজার একশত বাহাত্তর ফিট।! গরমে যখন অস্বস্তি লাগছিল তখন শুভ্র মেঘে-মালা শরীরে আছড়ে পড়ে প্রশান্তি এনে দিয়েছে। দিনের শেষে রাত হল, ভরা জোছনার আলো সম্বল করে বন-জঙ্গলের ভিতর দিয়ে হেটে যাচ্ছি বীরদর্পে। মাঝে মধ্যে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত হতে আসা ভ্রমন পাগলুদের সাথে হায়-হ্যালো হয়। আমরা যারা প্রকৃতি প্রেমি ঘুরতে গিয়ে ভয়কে জয় করে দেশের বিভিন্ন দুর্গম অঞ্চল চষে বেড়াই তাদেরকে অধিকাংশ পরিবার হতেই পাগল হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। সত্যিইত ভ্রমন পিপাসুরা পাগল। তা না হলে কি জীবনের মায়া ত্যাগ করে জাগতিক আনন্দ দুরে ঠেলে, পারিবারিক মায়া ভুলে গিয়ে ভ্রমনে বের হয়ে যাই অজানা অচেনা কোন পাথুরে পাহাড় কিংবা গহীন বন জঙ্গলের পথে। সময় সাতটা চল্লিশ মিনিট। দার্জিলিং পাড়ায় এসে হাজির।লাল জাইর হোটেলে সাময়িক বিরতি নিয়ে চা-নাস্তার পর্ব হল। এরপর আবারো হাটা শুরু।
রাত আটটা পনের মিনিটে হাজির হলাম কেওক্রাডং পাহাড় চুড়ায়। কটেজের প্রতিষ্ঠাতা লাল বম উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়ে রুম দেখিয়ে দিলেন। রাতের খাবার শেষে পরের দিনের জন্য চটজলদি ঘুুুুমিয়ে পড়ি, খুব সকালে পাহাড়ী মোরগের ধ্বনিতে ঘুম ভাঙ্গে। গাইড রেডি আমরাও রেডি। জাঁদিপাই ঝরনার উদ্দেশ্যে হাটা শুরু করতে সাতটা দশ বেজে যায়। এবারের পথ যেন আরো রোমাঞ্চকর আরো বেশি দুঃসাহসিকতার, এক কথায় এ্যাডভেঞ্চার কানায় কানায় পূর্ণ। ইতিমধ্যে জোঁক বাবুজি দেহ হতে কয়েক দফা রক্ত চুষে নিয়েছে। দেখা পেলাম পাহাড়ী সবুজ রঙের গাল চোকা সাপের, হিংস্র বন্য শুকুর আর বিষাক্ত চেলা। এসবই তুচ্ছ মনে হয়, পথ চলতে চলতে যখন কানে ভেসে আসে পাহাড়ী ছড়া, ঝিরী আর ছোট বড় ঝর্ণার রিমঝিম শব্দ, তখন এক অন্য রকম অনুভূতি ভিন্ন কোন এক শিহর ন মনে জাগে। জাঁদিপাই পাড়া এসে খানিকটা বিশ্রাম। সদ্য গাছ থেকে পাড়া কমলা লেবু আর ভুট্টা ভাজা খাওয়ার স্বাদ মনে থাকবে বহুদিন। আবারো সর্পিল পথ চলা শুরু, এবার শুধু নিচের দিকেই নামছি, ঘন্টা দেড়েক গিরিখাতে নামতেই চোখ ছানাবড়া , ওয়াও ! এত্ব সুন্দর আর এত বড় ঝর্ণা আগে কখনো দেখিনি এতদিন রংধনু আকাশেই দেখতে পেতাম কিন্তু জাঁদিপাই এসে দেখি অনবদ্য ঝর্নার পানিতে রংধনুর সাত রং। বম সম্প্রদায়ের যুবক লেমনের নিকট হতে জানতে পারি জাঁদিপাই মারমা শব্দ। আশ্চর্য রকম অদ্ভুত সুন্দর জাঁদিপাই ঝরনায় সত্যিই যাদু আছে। বিশাল এই ঝর্নার আকার, আকৃতি, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যে কোন পর্যটককেই কোন এক মায়ার যাদুঁতে জড়িয়ে ফেলবে। প্রকৃতির আপন খেয়াল জাঁদিপই ঝরর্নার অপার সৌন্দর্য বর্ণনাতিত। দীর্ঘক্ষন ঝর্নার জলে ভিজে প্রাকৃতিক ভাবে সৃষ্ট জলাশয়ে সাঁতার কেটে পুনরায় ইট, কাঠ আর উত্তপ্ত পিচ করা রাজপথ ঢাকামুখি যাত্রা। যোগাযোগ:-গাবতলী ও ছায়েদাবাদ হতে দিনে রাতে বিভিন্ন পরিবহনের বাস সার্ভিস বান্দরবানের পথে ছেড়ে যায়।সেখান থেকে বাসে কিংবা চাদের গাড়ীতে রুমা বাজার।বেলা চারটার মধ্যে পৌছতে পারলে সে দিনই ঝীপে করে বগালেক / কেওকেক্রাডং।ঝুম বৃষ্টির দিনে গাড়ী যাবে না তখন পায়ে হেটে যেতে হবে।রাতে কেওক্রাডং কটেজে থেকে পরের দিন খুব সকালে হাইকিং-ট্র্যাকিং করে ঝর্নার গান শুনতে জাদিঁ পাই ঝর্না।খরচ জনপ্রতি তিন দিনের জন্য পাচহাজার টাকা হলেই হবে।