নিজস্ব প্রতিবেদক | সর্বশেষ আপডেট: বৃহস্পতিবার, 18th জুলাই, 2019

নারীবিরোধী প্রবাদ প্রবচনগুলোও নারীবিদ্বেষ জিইয়ে রাখার সহায়ক

Share This
Tags
Print Friendly

85C28908-2FDD-42F2-A2D9-F4FD27F62C3Dআমাদের চারপাশে প্রচলিত প্রচুর প্রবাদ সরাসরি নারী বিদ্বেষে ইন্ধন যোগায়। মেয়েদের হেয় করার দরকার পড়লেই এইসব কুবচনগুলি ছুঁড়ে দেয়া হয়। এসব শুনতে আমাদের শ্রবণও অভ‍্যস্ত হয়ে যায়, আলাদা করে ভাবার কথা মনেই আসে না যে এসব প্রবাদগুলো সত‍্য নয়, মানুষেরই বানানো, অপর মানুষকে ছোট করার উদ্দেশ‍্যে।

লজ্জা নারীর ভূষণ

মেয়েরা চলবে পা টিপে, হাসবে মুখ টিপে। জোরে হাসা মানা, জোরে কথা বলা মানা, জোরে হাঁটা অবধি মানা। এগুলো করলেই জুটবে নির্লজ্জ, বেহায়ার তকমা। তাদের স্তন, নিতম্ব লজ্জার বস্তু, সমস্ত শরীরটাই তাদের বিষম লজ্জার। তিনপ্রস্থ কাপড়েও ঢাকা পড়বে না, ওড়না নামক বস্ত্রখণ্ড শরীরে চাপাতে হবে। ছোটো থেকে এগুলোই তাকে শিখিয়ে বড় করা হবে, তাকে হতে হবে লজ্জাবতী লতা, নরম সরম, ননীর পুতুল।

লজ্জা নারীর ঋতুচক্রেও। একটি স্বাভাবিক সহজ বিষয়কে অপবিত্র, গোপন ও লজ্জার বিষয় বানিয়ে রাখা হয় আমাদের সমাজে। প্রোটেকশান প্যাড আনতে শেখানো হয় কাগজে মুড়িয়ে। ঋতুকালীন গৃহবন্দী থাকার ফতোয়া তো ছিলোই! ঋতুকালীন ব‍্যবহৃত কাপড় চোপড় শুকোতে হয় অন্ধকার কোণাখামচিতে, সবার চোখের আড়ালে, যেখানে সূর্যের আলো না পৌঁছয়। ওই কাপড় থেকে সংক্রমণ হয়ে ভুগে ভুগে মরে মেয়েগুলো।

নারীর সাথে শ্লীলতাহানি বা ধর্ষণ ঘটলেও তাদের চুপ থাকতে হবে, কারণ সমাজ ধর্ষকের দিকে নয়, তাদের দিকেই আঙুল তুলবে। আইন আদালত তো দূর, জেনেশুনেও মুখে আনা যাবে না ধর্ষকের পরিচয়, বিশেষত ধর্ষক যদি হয় পরিবারের মধ‍্যের কেউ!

প্রতি পদে পদে এগিয়ে চলার বাধা হিসেবে চাপিয়ে দেয়া হবে এই লজ্জা নামক অবান্তর “ভূষণের” জগদ্দল ভার। ভারের তলায় পিষে পিষে মরবে মেয়েরা, তবেই সিস্টেম গাইবে সেই মেয়ের নামে জয়ধ্বনি!

বারো হাত কাপড়ে কাছা আঁটে না

অতীব অশ্লীল ইঙ্গিতময় একটি প্রবাদ, অর্থাৎ বারো হাত শাড়ীটি দিয়েও হে নারী, তুমি কোঁচা গুঁজতে পারো না। আঁচল কাঁধে দিতে হয় বক্ষ আবৃত করবার জন‍্য। এই প্রবাদটি বাঙালী নারীর জন‍্য‌ই সম্ভবত, কারণ দক্ষিণ ভারত ও মহারাষ্ট্রে নারীদের মধ‍্যে দিব‍্যি কোঁচা এঁটে শাড়ী পরবার প্রথা রয়েছে।

ছেলেরা সোনার আংটি, যা বাঁকা হয় না

পাত্রপক্ষ সুন্দরী গৃহকর্মনিপুণা শিক্ষিত পাত্রী চেয়ে বিজ্ঞাপন দেন। পরিবর্তে পাত্রের কি যোগ‍্যতা আছে এমন মেয়েকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পাবার, সে প্রশ্ন উঠলেই বলা হয় ছেলেরা সোনার আংটি, ও আবার বাঁকা হয় নাকি? অর্থাৎ পাত্রটির রূপগুণ কিছু না থাকলেও, সে সর্বগুণসম্পন্ন পাত্রী অপেক্ষাও শ্রেষ্ঠ ।

কোনো তথাকথিত কেলেংকার ঘটলেও, যেমন ধর্ষণ বা শ্লীলতাহানি, পুরুষটি দোষী হবেন না সমাজের চোখে, একথাও প্রাসঙ্গিক এ প্রবাদটির পক্ষে। এছাড়াও নারী পুরুষ দুজনেই কোনো ঘটনার অংশীদার হলেও, দোষ হবে একা মেয়েটির‌ই, কারণ পুরুষটি সোনার আংটি, তাঁর কলঙ্কের ভয় থাকে না।

হলুদ জব্দ শিলে, বউ জব্দ কিলে

একাধিক ধর্মের নিদান দেয়া আছে এই মর্মে, কথামতো না চললে বউকে মেরেই “সিধে” করতে হবে। স্ত্রী হলো অধীনস্থ প্রাণীর মতো। স্বামীর মতে মত দিতে সে বাধ্য। স্বামীর কথা পছন্দ হোক বা না হোক, মেনে নেয়াটা বাধ‍্যতামূলক, না মানাটাই অপরাধ। স্ত্রী কোনো স্বাধীন মানুষ বা স্বাধীন সত্ত্বা নন, স্বামীর অধীন মাত্র, তাই তাঁর স্বাধীন মতামত দেবার অধিকারের‌ও প্রশ্ন‌ই ওঠে না। স্বামীর মতে না চললেই স্ত্রীকে মৃদু থেকে শুরু করে চোর ডাকাতের মতো থার্ডডিগ্রি অবধি প্রহার করার অধিকার স্বামীর করায়ত্ত। ঢোল পশু আর নারী প্রহারের ওপর থাকলেই নাকি ঠিকঠাক থাকে! কাঁচা হলুদ যেমন শিলপাটায় ফেলে থ‍্যাঁতলালেই তার আসল রঙরূপ বেরিয়ে আসে, বাড়ির ব‌উকেও তেমনি কিল চড়ের ওপর রাখলেই সে তার আসল জায়গাটা বুঝতে পারে। স্ত্রীর মতামত ও চিন্তার ওপর স্বামীর মত চাপানো এবং শারীরিক নির্যাতনের মতো জঘন‍্য অপরাধকে মান‍্যতা দেবার জন‍্য এই প্রবাদের সৃষ্টি ।

পুড়বে মেয়ে উড়বে ছাই, তবে মেয়ের গুণ গাই

নারীর সহ‍্যশক্তি হতে হবে কল্পনাতীত। অত‍্যাচার, মারধর, কটুবাক‍্য, কিছুতেই প্রতিবাদ নয়। সতীদাহের সময় থেকেই অত‍্যাচার সয়ে মুখ বুজে থাকাকে মহান করে তুলে ফাঁদ পাতা হয়েছে। সংসারে মুখ বুজে মারধর, অপমান, অনাহার , বঞ্চনা সহ‍্য করে যাওয়াই এখনো অনেক মেয়ের রোজকার রুটিন। তার জন‍্য এটা নিয়তির পর্যায়ে, এটাই বিরাট অংশের বিশ্বাস। তাই এটা নিয়ে প্রতিবাদ বা রুখে দাঁড়ানো যাবে না, সহ‍্য করে থাকতে হবে দাঁতে দাঁত চেপে, তবেই সেই মেয়ে সমাজ সংসারের চোখে মহান প্রতিপন্ন হবে, এটাই এ প্রবাদের মূল কথা ।

পতিরত্ন যদি হয় নেশুড়ে বা খুনে,
সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে

স্বামী নেশা করে টাকা ওড়াক, মারতে মারতে মেরে ফেলুক, স্ত্রীকে চুপ করে মেনে নিতে হবে। প্রতিবাদ না থাকলে অশান্তিও নেই। আর যদি প্রতিবাদ করে, অশান্তি হয়, সেই দোষ স্ত্রীরই, কারণ, সংসার সুখের তো রমণীই করতে পারে! পতিরত্ন নেশা করবেন, সংসারের দায় নেবেন না, স্ত্রীকে একাই টানতে হবে সংসার ও সন্তানের ভার। প্রতিবাদের জায়গা নেই কারণ পতি তো পতিই নন, তিনি তো রত্ন! তাছাড়া প্রতিবাদ করলে আছে বৈধ লাঠ‍্যৌষধ! যে নারী বিনা প্রতিবাদে সব মেনে নিয়ে মুখ বুজে সংসার করতে পারবে, সেই হবে প্রকৃত রমণীরত্ন!

পুরুষ জেদে হয় বাদশা,
নারী জেদে হয় বেশ‍্যা

পুরুষ যদি মনে করে, সে সৎপথে উপার্জন করে সম্পদশালী হতে পারে। পক্ষান্তরে মেয়েরা যদি উপার্জন করে সম্পদশালী হতে যায়, সে বেশ‍্যা হয়ে যাবে, যেনো তার উপার্জনের একমাত্র পথ ওটাই! নিজের শরীর ছাড়া নারীর উপার্জনের অপর পথ নেই? যখন যে সময়ে দাঁড়িয়ে এই প্রবাদের সৃষ্টি হয়েছিলো, তখন এটাই ছিলো সার্বজনীন ধারণা। নারী যেনো অর্থনৈতিক স্বাধীনতার কথা না ভাবে, পরিবারের সিদ্ধান্ত মুখ বুজে মেনে নেয়, এটাই এ প্রবাদের মূল উদ্দেশ‍্য ।

ভাই বড়ো ধন হয় রক্তের বাঁধনে,
যদিও পৃথক হয় নারীর কারণে

পারিবারিক রাজনীতির বলির পাঁঠা হিসেবে বধূটিকে এগিয়ে দেয়া হয়। ভাইয়ে ভাইয়ে স্বার্থের দ্বন্দ্ব পুরোটাই স্ত্রীর ঘাড়ে চাপিয়ে তাকে দোষী বানানোর প্রাচীন চালাকি। এমনিতে যে স্বামী, তার স্ত্রীর কথায় গুরুত্বও দেয় না, তার ক্ষেত্রেও একথা সত‍্যি ‌ হয়ে ওঠে। সে স্ত্রীর পরামর্শেই ভাইয়ের সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়েছে। ভাইয়েরা পুরুষ, কলহ দ্বন্দ্বে তারা লিপ্ত হতেই পারে না, যদি না স্ত্রী অর্থাৎ নারী সে দ্বৈরথে ইন্ধন না যোগায়! সংসারে স্বার্থের দ্বন্দ্ব, ভায়ে ভাইয়ে সম্পত্তি নিয়ে কলহ, সবকিছুর মূলেই যেনো স্ত্রীর সক্রিয় ইন্ধন। স্ত্রী না থাকলে কলহ ইত‍্যাদি সংসারে যেনো থাকতোই না!

কথায় কথা বাড়ে, জলে বাড়ে ধান,
বাপের বাড়ি থাকলে মেয়ে বাড়ে অপমান

বিয়ের পর মেয়ে বাবা মায়ের কাছে থাকতে পারবে না, সেটাকে ঘোরতর অপমান বলে দাগিয়ে দেয়া হবে। যেনো মেয়ে সন্তানটি সন্তান নয়, ছেলেই একা সন্তান। পুত্র তার সমস্ত অধিকার নিয়ে সগৌরবে থাকবেন পৈতৃক সম্পত্তির ওপর, কন‍্যা থাকলেই তা অগৌরবের। বিবাহ মাত্র কন‍্যার পৈতৃক সম্পত্তির ওপর অধিকার হরণ ও সম্পত্তির ওপর পুত্রসন্তানের নিরঙ্কুশ অধিকার প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ‍্যেই এহেন প্রথা ও প্রবাদের জন্ম। ভারতীয় আইন অবশ‍্য ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে পৈতৃক সম্পত্তির ওপর কন‍্যা সন্তানের সমান অধিকার নিশ্চিত করেছে, সে বিবাহিত হলেও।

এ রকম হাজারটা কদর্থক প্রবাদে ভরে আছে আমাদের চারপাশ। কান পাতলেই শুনতে পাওয়া যায়। সুদূর অথবা অদূর অতীতকালে সৃষ্ট এসব প্রবাদের ছত্রে ছত্রে নারীর প্রতি বিদ্বেষ, বিরোধ। সমাজ ব‍্যবস্থায় নারীকে পায়ের তলায় পিষে রাখবার হাজারো আয়োজনের মধ‍্যে এগুলোও পড়ে। প্রবাদগুলো এমনভাবে ব‍্যবহার হয় যেনো তা অকাট‍্য, ঐশ্বরিক! মানুষকে অপমান করবার জন‍্য মানুষের‌ই নিকৃষ্ট সৃষ্টি নয়! আজকের দিনে দাঁড়িয়েও এসব প্রবাদ একেবারে মিলিয়ে যায়নি সমাজ থেকে! এখনো মফস্বলি ও গ্রাম‍্য সংস্কৃতিতে মেয়েদের দাবিয়ে রাখার জন‍্য ঘরোয়াভাবে এসব প্রবাদের ব‍্যবহার হয়, উচ্চারণ হয়। খাতায় কলমেই আমরা এগিয়েছি, প্রকৃতপক্ষে কতোটা এগিয়েছি, আমাদের এইসব প্রচলিত প্রবাদ প্রবচন দেখলেই বোঝা যায়। অর্ধেক আকাশকে অন্ধকারে ঢেকে রেখে, আলো থেকে বঞ্চিত করতে চেয়ে যে জাতি এগোতে চায়, তাদের সম্পূর্ণ আকাশ অন্ধকারে ঢেকে যাওয়াই তো স্বাভাবিক! আর হচ্ছেও তাই।