নিজস্ব প্রতিবেদক | সর্বশেষ আপডেট: সোমবার, 22nd এপ্রিল, 2019

ইসলামের সবচেয়ে বড় ভিক্টিম মসুলমানেরাই

Share This
Tags
Print Friendly

3370F704-00E9-4903-B5A6-BC496FF4A36Cকোনো নাস্তিক যখন ইসলামের সমালোচনা করে, ইসলাম নিয়ে প্রশ্ন তোলে, নবী আর আল্লাহ্‌কে নিয়ে প্রশ্ন করে তাহলে সেই নাস্তিকের বিরুদ্ধে সকল মুসলমানই তেড়ে আসেন। এই তেড়ে আসার তালিকায় এমন নয় যে শুধু গোড়া কিংবা চরমপন্থী মুসলমানরা থাকেন। এই তালিকায়, মাদ্রাসার কাঠমোল্লারা তো বটেই, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া সাধারণ মুসলমান থেকে শুরু করে সাপ্তাহিক শুক্রবার নামাজিরাও থাকেন। তেড়ে আসাদের তালিকা থেকে বাদ যান না বেনামাজী পারিবারিক মুসলমানও। নাস্তিক নিধনে সকলেই তখন এক কাতারে দাঁড়িয়ে যান।

কোনো মুসলমানকেই তখন মানুষের বাক-স্বাধীনতা প্রদানের বক্তব্যে পাওয়া যায় না। তখন অপেক্ষাকৃত শান্তিকামী অর্থাৎ মডারেটগণ এই বলে তেড়ে আসেন যে দুনিয়ায় কতো কিছু থাকতে ধর্মের পেছনে লেগেছেন কেনো? তারা এটা বুঝেন না যে দুনিয়ার সকল কিছুকে এই ধর্মগুলোই নষ্ট করে দিচ্ছে। আর বর্তমান প্রেক্ষাপটে ইসলামই নষ্ট করছে বেশি। বিজ্ঞনের মহামহা আবিষ্কারকে দাবী করে বসে ইসলামের বলে আবার সমকামীতা, নারী অধিকারের প্রশ্নে খেপা মোষের মতো তেড়ে আসে। সকল কিছুতেই বাগড়া দেয় ধর্ম। মনে করে দেখুন, বাংলাদেশে নারীনীতি বাস্তবায়নে কারা বাগড়া দিয়েছিলো, কাদের জন্য বাস্তবায়ন করা যায়নি নারীনীতি, কাদের জন্য তুলে দেয়া যায়নি সেকুলার রাষ্ট্রের সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম আর উদ্ভট বিসমিল্লাহ।

আবার এমনও মডারেট আমি দেখেছি, যিনি দুনিয়ার অনেক কিছু নিয়ে চিন্তা করেন, মনের দিক থেকে সুন্দর, মানুষের জন্য ভাবেন, দিনশেষে সেই মডারেটকেও বলতে দেখি নাস্তিকরা নাকি ইসলাম বিদ্বেষী। নাস্তিকদের কাজই নাকি শুধু ইসলামের বিরোধীতা করা। উনাদের মাথায় এই সামান্য বিষয়টা ঢুকে না যে বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে নাস্তিকরা ইসলামের সমালোচনাই করবে, কারণ এই দেশে নাস্তিকরা ইসলামেরই বাঁধার সম্মুখীন হয় এবং নাস্তিক নিধনে একমাত্র মুসলমানরাই তেড়ে আসে। এমনকি বাংলাদেশে অন্য ধর্মের লোকেরা নাস্তিক হত্যার দাবীতে মিছিল করেছে বলে জানা নেই যদিও অন্যান্য ধর্ম নিয়ে ভুড়ি ভুড়ি উপহাস নেটে পাওয়া যায়।

সে যাই হোক, মুসলমানদের আরেকটা সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো এরা নিজেরা কিছু জানে না। আপনি নাস্তিক জানার পরে প্রথমে কিছুক্ষণ এসে তর্ক করতে চাইবে। দুয়েক কথার পরে যখন আর যুক্তিতে পারবে না, তখন উপদেশ দেবে কোরান হাদীস ভালো করে বুঝার জন্য। এই কোরান হাদীস নাকি সাধারণভাবে পড়লে বুঝা যায় না, এ জন্য ভালো শায়খুল কোরান আর শায়খুল হাদীসের কাছে যেতে হবে।

যদিও কোরানে দাবী করা আছে যে তা সহজ সরল ভাষায় প্রনীত হয়েছে যেনো মানুষেরা সহজেই বুঝতে পারে, তথাপি যদি আপনি মোহাদ্দেস আর শায়খুল কোরান খুঁজেন তাহলে যাদেরকে পাবেন, তাদের সকলেই হচ্ছে মাদ্রাসার শিক্ষক, ওয়াজকরনেওয়লা মৌলানা। এই মৌলানাদের কুৎসিত, নারী বিদ্বেষী, অমুসলিম বিদ্বেষী এবং বিধর্মী(অমুসলিম) হত্যার ওয়াজ নিয়ে যখন মডারেটদেরকে প্রশ্ন করবেন, তখন আবার বলবে ওরা নাকি কাঠমোল্লা, ইসলামের কিছু জানে না। কিন্তু এইসব ওয়াজী মোল্লারা আবার সারা দেশে সেই মাপের জনপ্রিয়, হেলিকপ্টারে করে এদেরকে ওয়াজে নিতে হয়। এদের ওয়াজের প্রথম সারির পৃষ্ঠপোষক আবার এই মডারেট নামধারী মুসলমানগুলো। সময়ের অভাবে যদি ওয়াজে যেতেও না পারে অন্তত টাকা দিয়ে সাহায্য করে। এই ওয়াজী মোল্লারা যদি ইসলাম সম্পর্কে না জানে, তাহলে এদেরকে ওয়াজ করতে দিচ্ছে কারা? ওদের ওয়াজ শুনছে কার? ওরা কী মুসলমান না? ওরা যদি ভুল ইসলাম প্রচার করে, তাহলে সেটা কি ইসলামের অবমাননা না? মডারেটরা এদের প্রমোট করছে কেনো? এদের বিরুদ্ধে কিছু বলছে না কেনো?

সামান্য নাস্তিকের ফাঁসির দাবীতে সারাদেশ উত্তাল হয়ে যায়। মোশারফ করীমের নারী বান্ধব বক্তব্য মুসলমানদের দাবীতে তুলে নিতে হয়, ক্ষমা চাইতে হয় শুধু পরকালে বিশ্বাস না করা সাফা কবীরদের। অথচ, শফি মোল্লারা যখন ওয়াজে, সভায় সমাবেশে নাস্তিকদের হত্যা করার ফতোয়া জারী করে, নারীকে ঘরে রাখার নির্দেশ দেয় তখন কাউকে আর কথা বলতে দেখা যায় না। অথচ শফি মোল্লাদের বিরুদ্ধেই বেশি সোচ্চার হওয়ার কথা ছিলো কারণ, একজন নাস্তিক হয়ত কম জেনে ইসলামের অবমাননা করে ফেলতে পারে। কিন্তু মোল্লারা তো সরাসরি ইসলামকেই ব্যবহার করছে। কম জেনে ভুল মন্তব্যে বেশি অবমাননা, নাকি জেনে বুঝে অপব্যবহারের (মডারেটদের দাবী অনুযায়ী) মধ্যে বেশি অবমাননা?

আমার অনেক বন্ধু শুভাকাঙ্ক্ষী আছেন যারা আমার এই লেখায় কষ্ট পেতে পারেন। এ ধরণের লেখায় নাকি ঘৃনার উদ্রেগ ঘটে, ঘৃনাকে উস্কে দেয়া হয়। কিন্তু, নিদারুণ সত্য হলো, এগুলোই বাস্তবতা। বলুন দেখি, বাস্তবতাকে অস্বীকার করা যায় কিভাবে?

সত্যি কথা বলতে, আমি মুসলমানদেরকে অবিশ্বাস করি, সে যতই শান্তিকামী হোক না কেনো তাকে আমি কোনোভাবেই বিশ্বাস করতে পারি না। কারণ, আমি জানি মুসলমানদেরকে এমন শিক্ষা দেয়া হয় যে তারা মুসলমান ছাড়া পৃথিবীর আর কোনো মানুষকে মানুষ মনে করে না, ভালোবাসে না। পরিবেশ পরিস্থিতির কারণে যদি অমসলিমদের সাথে উঠাবসা করতে হয়, করে, সাথে সাথে লালন করে ঐ অমুসলিমের প্রতি ঘৃণা আর ওদের আল্লাহ্‌র কাছে এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি চায়। না, আপনার বই পড়া জ্ঞান থেকে আমি এ কথা বলছি না, আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকেই এ কথা বলছি। আমি কাঠমোল্লা থেকে শুরু করে সাধারণ ধর্মভীরু মুসলমানদের সাথে উঠাবসা করেছি। মডারেটদের কথা নাই বা বললাম।

বাংলাদেশে আমি এমন এক অজপাড়া গাঁয়ে জন্মেছিলাম যে গ্রামে এখনও কোনো সড়ক নেই সদরে যাবার জন্য। আমার গ্রাম থেকে সদরে যেতে হলে এখনও আগে আলপথ মাড়িয়ে যেতে হয়। এখনও আমার জন্মগ্রামে বিদ্যুতের ছোঁয়া লাগেনি। আমি দেখেছি অন্ধকারাচ্ছন্ন মুসলমান কেমন, তাদের ভেতরেই বেড়ে উঠেছি তো! এ তো বেশিদিন আগের কথা নয়, শুধু আমার গ্রাম কেনো, জেলা শহরের হোটেল রেস্তোরায় উসামা বিন লাদেন-এর পোস্টারও তো দেখেছি। ঐ পোস্টার সাঁটানো মুসলমান নিজে জংগি না, গোঁড়া না, জীবনে একদিন নামাজও পড়ে না কিন্তু অমুসলিমদের প্রতি ঘৃণাটা ঠিকই লালন করে বসে আছে।

জার্মানীতে আসার দুই বছর হলো এই এপ্রিলে। এই দুই বছরে, এখানকার বাংলাদেশি মুসলমানদেরকেও কিছুটা যে দেখিনি তা নয়। জীবীকার তাগিদে এরা কাফেরদের দেশে, কাফেরদের অধীনে চাকরী করে ঠিকই। দিনশেষে আবার গালিও দেয় কাফেরদেরকে। ওদের সাথে কথা বলে দেখেছি, ওরা বিশ্বাস করে একদিন জার্মানী মুসলমানদের অধীনে আসবে, তখন কচুকাটা করা হবে কাফেরদেরকে। জ্বী, এটাই মুসলমানদের মানসিকতা, এটাই বাস্তবতা, এটাই এদের ধর্মের শিক্ষা।

বিধর্মী অর্থাৎ অমুসলিমদের প্রতি এই ঘৃণা লালন করার কিন্তু ইসলামিক কারণও আছে। মুসলমানদেরকে এই শিক্ষা দেয়া হয় যে তাদের ঈমানের স্তর হচ্ছে চারটি। সর্বোচ্চ স্তরে হচ্ছে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করার জন্য জীবন দেয়া অথবা নেয়া অর্থাৎ জিহাদ। এর পরের স্তরে প্রতিরোধ, এভাবে প্রতিবাদ। আর নিতান্তই যদি কিছু করার ক্ষমতা না থাকে, তাহলে মনে মনে হলেও অমুসলিমদের প্রতি ঘৃনার লালন করা। আমাদের সাধারণ মুসলমানরা হলেন সেই স্তরের, উনারা ঘৃণাটা লালন করেন বেশ। মডারেটরা জারী রাখেন প্রতিবাদ, আর জঙ্গিরা পালন করে সর্বোচ্চটা।

সাচ্ছা কথা হলো, মুসলমানরা শুধুই বিধর্মী অর্থাৎ অমুসলিমদের দোষটা দেখে। এদের চোখে মুসলমানের দোষ ধরা পরে না। এরা ইসলামের অবমাননা সহ্য করে না, রাস্তায় নেমে যায়, উগ্রতা প্রদর্শন করে। ওয়াজে, মাহফিলে অমুসলিমদের প্রতি ঘৃণা বিদ্বেষ ছড়িয়ে দেয়, একসঙ্গে শ্লোগান ধরে। আর মুসলমানদের দোষ ধরা পরলে ‘ইসলামের সাথে সম্পর্ক নেই’ বলে পাশ কাটিয়ে যায়। আর দিনে দিনে ইসলামের প্রতি মানুষদের ঘৃণা বেড়েই যায়, ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে মুসলমানরাই।

হায়! ধর্মভীরু সাধারণ মুসলমান থেকে শুরু করে আমাদের মডারেট মুসলমানরা যদি বুঝতো, দিনশেষে ইসলামের সবচেয়ে বড় ভিক্টিম হচ্ছে মসুলমানেরাই !

Show Buttons
Share On Facebook
Share On Twitter
Share On Google Plus
Share On Pinterest
Share On Youtube
Hide Buttons