নিজস্ব প্রতিবেদক | সর্বশেষ আপডেট: শুক্রবার, 5th এপ্রিল, 2019

দুর্নীতি বন্ধ করুন, শ্রমিকদের পাওনা দিন – লোকসানি পাটকল

Share This
Tags
Print Friendly

Screen Shot 2019-04-05 at 08.03.56বকেয়া বেতন পরিশোধসহ ৯ দফা দাবিতে সরকারি খাতের পাটকলশ্রমিকদের ৭২ ঘণ্টার ধর্মঘট বৃহস্পতিবার শেষ হলেও সংকট কমবে না বাড়বে, তা নির্ভর করছে সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর। মার্চের মতো এবারের শ্রমিক ধর্মঘট পুরোপুরি শান্তিপূর্ণ ছিল বলা যাবে না। ধর্মঘটের শেষ দিনে খুলনায় সংঘর্ষে চারজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। বাংলাদেশ পাটকল সংস্থা (বিজেএমসি) বলেছে, লোকসানের কারণে শ্রমিক-কর্মচারীদের ঠিকমতো বেতন–ভাতা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে শ্রমিকদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপকদের অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো লোকসান দিচ্ছে। শ্রমিকেরা ধর্মঘট পালনের পাশাপাশি রাজপথ ও রেলপথ অবরোধ করায় খুলনা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন স্থানে গণপরিবহনেও অচলাবস্থা দেখা দিয়েছে। শুধু অর্থের অঙ্কে এ ক্ষতি পরিমাপ করা যাবে না।

বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের অধীন বিজেএমসির আওতায় ২৬টি পাটকলের মধ্যে বর্তমানে চালু আছে ২৫টি, যার ২২টি পাটকল ও তিনটি নন-জুট কারখানা। পাটকলগুলোতে গত জুন পর্যন্ত ২৭ হাজার ৭২১ জন স্থায়ী শ্রমিক এবং ৩ হাজার ৭৩০ জন কর্মচারী ও কর্মকর্তা ছিলেন। এ ছাড়া তালিকাভুক্ত ২৩ হাজার ২৭৮ জন বদলি শ্রমিক এবং ৬ হাজার ৫৪৮ জন শ্রমিক দৈনিক ভিত্তিতে কাজ করেন। কারখানাগুলো ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৪৬৬ কোটি টাকা এবং চলতি অর্থবছরের ৮ মাসে ৩৯৫ কোটি টাকা লোকসান গুনলেও কর্তৃপক্ষের চৈতন্যোদয় হয়েছে বলে মনে হয় না। শ্রমিক ধর্মঘটের পরিপ্রেক্ষিতে বিজেএমসি জাতীয় মজুরি স্কেল ২০১৫ অনুযায়ী মজুরি নির্ধারণের প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য সব পাটকলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের লিখিত নির্দেশনা দিয়েছে। শ্রমিকেরা বর্তমানে পূর্ববর্তী মজুরিকাঠামোয় মজুরি পেয়ে থাকেন।

কারখানাগুলোর লোকসানের দায় কোনোভাবেই শ্রমিকদের ওপর চাপানোর সুযোগ নেই। এর দায় ব্যবস্থাপক তথা বিজেএমসিকেই নিতে হবে। বেসরকারি পাটকলগুলো লাভজনক হলে কেন রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানাগুলো ফি বছর বিপুল অঙ্কের লোকসান দিচ্ছে, সেই প্রশ্নের উত্তর তাদেরই দিতে হবে।

শ্রমিকদের কাছ থেকে যে গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে তা হলো মৌসুমের শুরুতে যখন পাটের দাম কম থাকে, বিজেএমসি তখন পাট না কিনে পরে বেশি দামে কেনে। এ বিষয়ে সংস্থাটির সময়মতো বরাদ্দ না পাওয়ার অজুহাতও ধোপে টেকে না। সময়মতো বরাদ্দ আনার দায়িত্ব কি তাদের নয়? সরকারি খাতের প্রায় প্রতিটি পাটকলে বিপুল পরিমাণ উৎপাদিত পণ্য পড়ে আছে। পাটপণ্য বিক্রির দায়িত্ব নিশ্চয়ই শ্রমিকদের নয়। এসব দায়িত্ব পালনে যঁারা ব্যর্থ হয়েছেন, তঁাদের কারও বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে—তা জানার অধিকার নিশ্চয়ই জনগণের আছে।

প্রধানমন্ত্রী যেখানে বলেছেন, সরকারি পাটকলে লোকসানের কারণ দেখেন না, সেখানে কেন শত শত কোটি টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে এবং কাদের কারণে তা হচ্ছে, সেসব খতিয়ে দেখতে হবে। রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোকে রক্ষা করতে হলে পাট ক্রয় থেকে উৎপাদিত পণ্য রপ্তানি পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি জরুরি। লোকসানের দোহাই দিয়ে শ্রমিকদের নতুন মজুরিকাঠামো থেকে বঞ্চিত করা হলেও বিজেএমসি ও সংশ্লিষ্ট কারখানার কর্মকর্তারা যথারীতি নতুন বেতনকাঠামো অনুযায়ী বেতন–ভাতা আদায় করে নিয়েছেন। এই স্ববিরোধিতা চলতে পারে না।

স্বাধীনতার পর থেকে বিজেএমসির কর্তাব্যক্তিরা নিজেদের আখের গোছাতে যত ব্যস্ত ছিলেন, কারখানাগুলো লাভজনক করার ক্ষেত্রে ততটাই নিস্পৃহ ছিলেন। দিনে দিনে অনেক দেনা বেড়েছে, এখন শোধ করার পালা। বিজেএমসি যদি পাটকলগুলো লাভজনকভাবে চালাতে ব্যর্থ হয়, তবে সেগুলোকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া ছাড়া আর পথ কী? বিজেএমসির মতো শ্বেতহস্তী পোষার জন্য রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বাঁচিয়ে রাখার কোনো অর্থ হয় না।

Show Buttons
Share On Facebook
Share On Twitter
Share On Google Plus
Share On Pinterest
Share On Youtube
Hide Buttons