নিজস্ব প্রতিবেদক | সর্বশেষ আপডেট: মঙ্গলবার, 2nd ফেব্রু., 2016

হুমায়ুন আজাদ থেকে অভিজিৎ: আমরা কি ভুলতে পারি- অজয় দাশগুপ্ত

Share This
Tags
Print Friendly

দুনিয়ার আর কোনো দেশে বছরের মাসগুলো এভাবে চিহ্নিত করার রেওয়াজ আছে কিনা জানা নেই। একদিক থেকে উত্তম। কলহদীর্ণ জাতিতে এখনও মৌল বিষয়ে ঝগড়া-ফ্যাসাদ লেগে থাকার কারণে মাসগুলোকে চেতনা বা অর্জনের ভিত্তিতে নামকরণে হয়তো কিছুটা কাজ হয়। ভ্রান্তি-বিভ্রান্তির বেড়াজালে আটকে থাকা তারুণ্যের মনে কি একটু হলেও ভাবনা দোলা দিয়ে যায় না?

মুশকিলটা এই, যারা নামগুলো দিয়েছেন বা এর পেছনে কাজ করেছেন তারা আর এগুলো নিয়ে ভাবেন না। একদল বানিয়ে দিয়ে এখন নিজেদের গৌরব, অহংকার ও আসন পাকাকরণে ব্যস্ত। আর একদল খেয়ে না-খেয়ে জাতির পশ্চাৎদেশে আঘাত দান আর মিথ্যে কথার রাজনীতিতে মত্ত। ঘাপটি মেরে থাকা আসল দল এসবের ফাঁকে তাদের চেহারা নিয়ে বেরিয়ে আসে। মাঝে মাঝে জানিয়ে দেয়, আমরা আসলে এক ধরনের সুতোর ওপর ঝুলে আছি।

কথাগুলো বললাম এই কারণে যে, ভাষার মাস নামে পরিচিত ফেব্রুয়ারি মাস শুরু হয়ে গেছে। মানুষের মনে বা চিত্তে যাই থাকুক না কেন, মিডিয়ার কারণে আমাদের জানতেই হবে যে, এদেশে আসে ফাগুন, আসে একুশে ফেব্রুয়ারি।

ঢাকার বুকে একদা চিত্তরঞ্জন সাহার হাতে গড়ে ওঠা ছোট বই মেলাটি আজ মহীরুহ। তার সুনাম-যশ-খ্যাতি একদা বাংলা সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র কলকাতার বই মেলাও ম্লান করে দিতে পারে। দেয়ও বটে। কিন্তু মাত্র কয়েক বছর আগেও আমরা ভাবিনি যেখানে সারস্বতচর্চা, যেখানে হাদিসের ভাষায় মানুষের চোখ খোলার কথা, সেখানে এতটা জঘন্য ও বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে।

গেল বারে দেশে ফিরে যাব কী যাব না ভাবতে ভাবতে টিকেট বুকিং দিয়ে যখন বন্ধুদের সারপ্রাইজ দেব বলে মনস্থির করেছিলাম, ঠিক তখন বই মেলার বাইরে খোলা রাস্তায় প্রাণ হারালেন এক লেখক। বাংলাদেশে ‘ব্লগার’ নামের যে লেখকরা লেখালেখি করেন তাদের জনপ্রিয়তা যাই হোক না কেন, তারা মুদ্রণ বা টিভি মিডিয়ায় বিচরণরতদের মতো পপুলার বা সর্বত্রগামী নন। তাদের ভুবন তাদের একান্ত নিজস্ব। সে জায়গায় যারা তর্ক-বিতর্কে নিজেদের চেতনা ও চিন্তা শুদ্ধ করার কাজে আছেন, তাদের কেউ এমন ভয়াবহ নির্মমতার শিকার হতে পারেন, আমরা কি কোনো দিন ভেবেছিলাম?

তাদের ভুবন তাদের একান্ত নিজস্ব, তাদের কেউ এমন ভয়াবহ নির্মমতার শিকার হতে পারেন, আমরা কি কোনো দিন ভেবেছিলাম

 

ভাষার মাস নামে ফেব্রুয়ারিকে যতই গৌরবে ভরিয়ে তুলি না কেন, এই যুবকের অপমৃত্যুর আগেও কিন্তু আমরা এদেশের মুক্তবুদ্ধির আরেক লেখকের ওপর আক্রমণ দেখেছি, এই বই মেলাতেই। হুমায়ুন আজাদের রক্তাক্ত শরীর ও বীভৎস চেহারা দেখে আমরা যখন আতঙ্কিত, তখন সিডনি-প্রবাসী এক ওয়েব মাস্টার আমাকে খুব নিরীহ ভঙ্গিতে তার মনের সাংঘাতিক কদর্য রূপ প্রকাশ করে একটি প্রশ্ন করেছিলেন।

এই ভদ্রলোক কেতাদুরস্ত। মধ্যবয়সী। প্রায় অনুষ্ঠানে আমার হাতে যখন পানির গ্লাস থাকে, তখন তাকেও দেখি পরম তৃপ্তির সঙ্গে বিয়ারে চুমুক দিতে। এরা বা এদের মতো পোশাকে-লেবাসে আধুনিকরা কথিত রাজাকারদের চেয়েও ভয়ংকর। তিনি খুব নির্দোষভাবে প্রশ্ন করলেও তার ভেতরে ছিল বদমতলব।

খেয়াল করলে দেখবেন, রক্তাক্ত হুমায়ুন আজাদের ছবির পাশে একজন লোক তাঁকে ধরে ছিলেন। পাশে এক তরুণের মুখে ভয়ের ছাপ। সে দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে আছে। এই ভদ্রবেশী রাজাকার হুমায়ুন আজাদের মৃত্যুর আগেই আমাকে কৌতুক করে হাসতে আসতে বলছিলেন, পাশের ছেলেটি নাকি হাসছে। তার প্রশ্ন, এমন ঘটনার পর কি কেউ হাসে? সেদিন ঘটনার হতবিহ্বলতায় না বুঝলেও এখন বুঝি, বদলে যাওয়া মানসিকতার এই মুসলিম লীগারের মনে তখন প্রচ্ছন্ন খুশি। তারা তখনই প্রহর গুণছিল, কখন হুমায়ুন আজাদের জীবনাবসান হবে তার জন্য।

ভাষার মাসের গর্বে বলীয়ান আমরা তাঁকে বাঁচাতে পারিনি। শোনা যায়, সুদূর জার্মানিতে তাঁর মৃত্যুর পেছনেও নাকি কালো হাত কাজ করেছিল। এখন আর অবিশ্বাস করি না। আমরা সে ঘটনার পর নিয়মমাফিক হা-হুতাশ আর ‘বিচার চাই বিচার চাই’ বলে আবার নিস্তেজ হয়ে গেলাম। কত সরকার এল গেল, বিচার আর ঠিকমতো হল না। সাজা হলে অপরাধী জানত এমন ঘটনা করে পার পাওয়া যায় না। কিন্তু হয়নি। ফলে তারা ভেতরে ভেতরে শক্তিশালী হয়ে আবার আঘাত হানার জন্য প্ল্যান করবে, এটাই তো স্বাভাবিক।

তাই আরও অনেক বছর পর বই মেলার বাইরে রাতের আঁধার ঘনীভূত হবার আগেই নির্মম আক্রোশের শিকার হলেন নবীন প্রাণের আরেক লেখক। একটা জায়গায় কিন্তু মিল রয়েছে তাদের। যদিও তাঁরা জনপ্রিয়তা, মানে বা সম্মানে একে অপরের চেয়ে ভিন্ন, কিন্তু চিন্তা ও চেতনার ব্যাপারে ছিল তাদের অভিন্ন বোধ। সেটাই কাল হল দুই লেখকের।

হুমায়ৃন আজাদের সময়কার আক্রমণ ও সাহসের অপধারা এ সময় আরও ভয়ানকভাবে পাল্টে গেছে। আক্রমণকারীরা এখন জানে, লাখো মানুষের শা্হবাগ বা চেতনা সাইজ করার জন্য শাপলা চত্বর যথেষ্ট। তারা এ-ও জেনে গেছে যে, শান্তি শান্তি করলে এমন অরাজকতা তৈরি করা যায় যাতে সরকারও বলে, ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’। জনগণ তো আরও সরেস। তারা এ-ও জানে, হৈচৈ বাঁধাতে পারলে রেলওয়ের জমিজমা ও এজমালী সম্পত্তির মালিকানা পাওয়া যায়। ফলে যা ঘটার তাই ঘটল।

তারপরও নিয়তি ছেড়ে কথা বলে না। শোনা যায়, হুমায়ুন আজাদের মৃত্যুকে যারা তাঁর ‘বাড়াবাড়ির কারণে মৃত্যু’ বলেছিলেন, তাদের পরিবারেও এই চাপাতি আঘাত হেনেছে।

আজ আবার আমরা ফেব্রুয়ারিতে এসে দাঁড়িয়েছি। সবগুলো মিডিয়ায় বই মেলার খবরের পাশাপাশি নিরাপত্তার কথা লেখা হয়েছে, বলা হচ্ছে। এটাই কি আমাদের অর্জনের নমুনা?

প্রসঙ্গান্তরে গিয়ে বলি, এই যে আমরা আমাদের ভাষা ও ভাষা শহীদদের নিয়ে গর্ব করি, আসলে কি ধারাবাহিকভাবে তাদের শ্রদ্ধা বা লালনের ব্যাপারটা আছে কোথাও? একদিন নগ্ন পায়ে মিছিল, বেদীতে ফুল দেওয়া আর মাসব্যাপী মিডিয়া উৎসবের বাইরে একুশের এই মাসের বিস্তৃতি কোথায়?

ঢাকার বা দেশের তরুণ-তরুণীদের সঙ্গে কথা বললে ভিমরি খেতে হবে। তাদের আপনি তিন ভাগে ভাগ করে নিতে পারেন। একদল বলবে, ‘‘জানেন আঙ্কেল, আপনার পোশাক আর চশমাটা না, ‘বিন্দাস’। কতদিন আপনাকে দেখি না, আপনার জন্য আমার মনে ‘হামদর্দি আছে’।’’

শুনে ভাবি, হামদর্দ কোম্পানির সিরাপ বা সরবত এখনও আছে তাহলে!
আর এক দল বলবে, ‘‘দৌড়ের ওপর আছি, আঙ্কেল।’’‘এত ব্যস্ত কেন?’’ ‘‘আবার জিগায়?’’

শেষ দলের চলন-বলন কথা-বার্তা বিদেশিদের কাছেও দুবোর্ধ্য। কথার ছিরি শুনবেন? ‘‘আপনি এত ক্রেজি কেন? রিকু পাঠালে একসেপ্ট করেন না। আমাকে রেপ করেন, প্লিজ।’’

শুনে তো আত্মারাম খাঁচাছাড়া হবার যোগাড়। আসলে খুব নিরীহভাবে ফেইসবুকে বন্ধু হতে চাইছে!

আরও আছে। দেশের সর্বাধিক প্রচারিত নামে পরিচিত আলোতে দেখবেন মায়াকান্না। ফেব্রুয়ারি এলে নাকি সারা দুনিয়া আমাদের দিকে অবাক তাকিয়ে রয়। তো তারা কী করে? যারা এককালে ভাষা বা শহীদদের জন্য ভালোবাসা রাখত আর এখন ইতিহাস ও আন্দোলনের বারোটা বাজাতে সচেষ্ট, তারা খুঁজে খুঁজে তাদের নিয়ে আসে। তাদের দিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ায়। ভাবখানা এই যে, দেশের সব কিছুর দায়-দায়িত্ব এখন তাদের ওপর!

এককালে জাফর ইকবালকে যখন ছেলেমেয়েদের লেখা ছাড়া আর কিছুর জন্য ঠিক পছন্দ করতে পারতাম না, তখন তিনি ছিলেন এদের গুরু। আজ যখন তিনি গা-ঝাড়া দিবে মুক্তিযুদ্ধের দিকে সবল ও বলিষ্ঠ, তাদের ছানা-পোনারা মাঠে নেমে বলছে, ‘স্যারের আসলে ভুমিকা কী? তিনি দেশের জন্য কী করেন?’

ভাষার মাসে এহেন ভাষাবাজিও কি ধোঁকা নয়?

এবার একটা জরুরি কথায় আসি। বিশ্ব জয় করার মতো ভাষা সংগ্রাম বা আন্দোলনের পরও আমাদের দেশের আইন, বিচার, চিকিৎসা বা বিজ্ঞানে কি সব বই বাংলায় পাওয়া যায়? আছে কি আমাদের সেই বাংলা তথ্যভাণ্ডার? ‘চেকোস্লোভাকিয়া’ নামে যে ছোট একটা দেশ ছিল। সেটা এখন ভেঙ্গে দু টুকরো। এক ভাগের নাম ‘চেক’, আরেকটা ‘স্লোভাক’। এই চেক প্রজাতন্ত্রের এক অধ্যাপক আমাকে বলছিলেন, তিনি বাংলাদেশ ও বাংলা ভাষার আন্দোলনে গর্বিত, কিন্তু জেনে অবাক হয়েছেন যে, আমরা এখনও সব বিষয় বাংলায় করতে বা জানতে পারি না। অথচ মাত্র এক কোটি পাঁচ লাখের কাছাকাছি সংখ্যার চেক জনগণের জন্য তাদের ভাষায় সব ধরনের বই পাওয়া যায়। নাম বললেই তারা তা যোগাড় করে দেবে। এমন দেশ দুনিয়ায় অজস্র।

আমরা করি না। কারণ আমাদের কাছে বই মেলা মানে আত্মপ্রকাশ বা বাণিজ্য। নবীন কবিদের নবীন লেখকদের লেখা সমস্যা নয়, পুস্তকও সমস্যা নয়, সমস্যা হল বিষয়। বিষয় না বদলালে মানুষ ঝালমুড়ি, কফি আর আড্ডা দিতে যাবে– দু চারটে বইও কিনবে– বাংলা এগুবে না।

বলছিলাম, আজ যখন ফেব্রুয়ারিতে আমাদের পুলিশ কমিশনারকে নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলতে হয়– তা-ও ভালো যে, তাঁরা এ নিয়ে ভাবেন– কিন্তু ডিএমপি কমিশনার কী বললেন? পর্যা্প্ত আলোর অভাবেই নাকি অভিজিতকে খুন করা সম্ভব হয়েছিল। এবার তারা চারদিক আলোয় ভরিয়ে দেবেন যাতে এমন আর না হতে পারে। বিশ্বাস করতে পারলে খুশি হতাম। অভিজিতের স্ত্রীর আর্তচিৎকারের পরও পুলিশ যে আসেনি তা কি আলোর স্বল্পতার কারণে?

আর এই যদি সত্য হয় তো শুদ্ধস্বরে হামলা কি রাতের বেলা হয়েছিল? ঘরে ঢুকে যাদের মারল, তারা তো সব দিনের টগবগে আলোয় প্রাণ হারিয়েছিল। দীপনের মৃত্যু কিন্তু প্রমাণ করেছে কী এক অদ্ভূত আঁধার নেমে এসেছে আজ। সেই অন্ধকার দূর না হলে খুন বা চাপাতি থামবে না।

তবু ফেব্রুয়ারি এসেছে। আমাদের প্রাণের মাস। আমাদের নাম-গোত্রহীন করে দেওয়ার বিরুদ্ধে জীবন উদ্বোধনের মাস। শহীদের নামে মিনারে উদ্ভাসিত বাংলা নামের ভাষার এক আশ্চর্য জাগরণের মাস। এ মাসে আর কেউ প্রাণ হারাক চাই না। বই মেলার মতো পবিত্র তীর্থ কেবল আইন বা বাহিনী দিয়ে নিরাপদ রাখা অসম্ভব। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনা প্রমাণ করেছে আমাদের ভেতরেই আছে আমাদের দুশমন। তাই মনের রাজাকারি, দোআঁশলা হাফ-পাকি হাফ-বাংলা চেতনা, স্বর্গ-নরকের ভয় কাটিয়ে যদি সবাই নিজেদের বাঙালি ভাবতে পারি তবেই না মুক্তি।

না পারলে নিজের মতো থাকুন। দেশ ও মানুষের মনে ভয় ধরানোতে কাজ কী আপনার?

আমরা তো বড় বিস্মরণপ্রিয় কৃতঘ্ন জাতিও বটে। কাউকে মনে রাখি না। জাতির জনককে অপমান করি। তাজউদ্দিনকে ভুলে যাই। তিরিশ লাখের অবজ্ঞা করি। ইতিহাস মানি না। এমন জাতির হৃদয়ে কি অভিজিতরা আসলে বেঁচে থাকেন কোথাও?

বই মেলা, তোমার কাছে এই প্রশ্ন রাখব আজীবন।

Show Buttons
Share On Facebook
Share On Twitter
Share On Google Plus
Share On Pinterest
Share On Youtube
Hide Buttons