নিজস্ব প্রতিবেদক | সর্বশেষ আপডেট: মঙ্গলবার, 2nd জুন, 2015

পবিত্র শবেবরাত

Share This
Tags
Print Friendly

putrajaya_mosque__269079833

তাং ০২.০৬.২০১৫ ইং
মোঃ শাহাবুদ্দীন

শব ফার্সি শব্দ। এর অর্থ রাত্রি। বরাত আরবি শব্দ। এর অর্থ মুক্তি। তাই শবেবরাত অর্থ মুক্তির রজনী। আরবি শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতকে (১৫তম রজনীকে) শবেবরাত বলে। আবার একে অনেকে লাইলাতুল বরাতও বলে থাকেন। যার শাব্দিক অর্থ- মাগফিরাত বা মুক্তির রাত।বিশ্বাস করা হয়, এই রাতে মানুষের ভাগ্য যেমন নির্ধারণ করা হয়, তেমনি পাপ থেকে নিষ্কৃতির সুযোগ পাওয়া যায়।

শাবান মাস বরকতময় একটি মাস। এ মাসকে রমজানের মুয়াজ্জিন হিসেবে অভিহিত করা হয়। সালাত আদায়ের জন্য মুয়াজ্জিন যেমন ডাক দেন তেমনি মাহে রমজানের সিয়াম সাধনার জন্য মুমিনদের প্রস্তুত হওয়ার তাগিদ দেয় এই মাস।

পাক-ভারত উপমহাদেশে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতে শবেবরাত পালন করা হয়। তবে সৌদিআরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিমরা শবেবরাত পালন করেন না।কারণ শবেবরাতের ব্যাপারে অকাট্য কোন দলিল নেই।

শবেবরাত উপলক্ষে কাল বুধবার সরকারি ছুটি।

অনেকে ধর্মীয় বিধান মনে করে গরিবদের মধ্যে হালুয়া-রুটি, মিষ্টি ইত্যাদি বিতরণ করেন। শবেবরাত উপলক্ষ্যে হালুয়া-রুটি খাওয়া এবং তা দরিদ্রদের মাঝে বিতরণ করা ধর্মীয় বিধান নয়। এ প্রথা চালু হয় বৃটিশ আমলে ভারতীয় উপমহাদেশে।তখন উপমহাদেশের আলেমগণ দেখলেন, হিন্দুরা বিভিন্ন ধরনের পূজা-পার্বন এবং আনন্দ-উৎসব করে থাকে। মুসলমানরা সেদিকে ঝুঁকছে। তাদের দৃষ্টি ফেরাতে রুটি-হালুয়া চালু করেন।

কেউ কেউ শবেবরাতের রাতে বাড়িতে বা কবরে আলোকসজ্জার আয়োজন করেন।আবার শহরাঞ্চলে শবেবরাতের রাতে কিশোররা পটকা ফোটায়, যা একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক এবং বেআইনি। আলোকসজ্জা এবং পটকা ফোটানো অপচয় এবং শয়তানী কাজ, যা রীতিমতো ইসলাম বিরোধী।

পবিত্র কুরআনের একটি সূরায় ‘লাইলাতুল মোবারাকাহ’ শব্দের উল্লেখ পাওয়া যায়, যাতে বলা হয়েছে – ‘এটা সে রাত যাতে প্রতিটি বিষয়ের বিজ্ঞতাপূর্ণ ও দৃঢ় সিদ্ধান্ত আল্লাহর নির্দেশে প্রকাশ করা হয়।’ (সূরা দুখান, আয়াত ৩ ও ৪ )। কোনো কোনো তাফসিরকারক এ আয়াতকে উদ্ধৃত করে সেটাকেই শবেবরাত বলে অভিমত দিয়েছেন।

ইবনে কাসির তার তাফসির গ্রন্থে এবং ইবনুল আরাবি তার আহকামুল কুরআনে ওই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, মধ্য শাবানের রাতে ভাগ্যের ফয়সালা হয়ে থাকে।অন্য দিকে হজরত ইবনে আব্বাস রা:, ইবনুল উমার রা:, মুজাহিদ রা:, কাতাদা রা:, হাসান বসরী রা:-সহ বেশির ভাগ প্রসিদ্ধ তাফসিরবিদ ‘লাইলাতুল মুবারাকাহ’ বলতে লাইলাতুল কদরকে আখ্যায়িত করেছেন, যা রমজান মাসে আসে।

এই পুণ্যময় রজনীর ফজিলত ও তাৎপর্য বহু হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। তবে শবেবরাত সম্পর্কিত হাদিসগুলোর বর্ণনাকারী দুর্বল বলে অনেকে মত দিয়েছেন। নিম্নে কয়েকটি হাদিস উল্লেখ করা হলো।হজরত আলী (রা.) বলেন, রসুল (সা.) বলেছেন, যখন শাবান মাসের ১৫তম রজনী আসে তোমরা রাত্রিতে নামাজ পড় এবং দিনে রোজা রাখ। কারণ আল্লাহতায়ালা সেদিন সূর্যাস্তরে সঙ্গে সঙ্গে দুনিয়ার আসমানে আসেন এবং বলতে থাকেন, কেউ আছে কি গুনাহ মাফ চাইবে, আমি তার গুনাহ মাফ করে দেব। কেউ আছে কি রিজিক চাইবে, আমি তাকে রিজিক দান করব। কেউ আছে কি অসুস্থ, আমি তাকে সুস্থ করে দেব। আল্লাহপাক এভাবে ডাকতে থাকেন ভোর র্পযনত। ইবনে মাজাহ।

অপর হাদিসে এরশাদ হচ্ছে, হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, একদিন রসুল (সা.) বললেন, হে আয়েশা! এ রাতে কী হয় জানো? হজরত আয়েশা পাল্টা প্রশ্ন করলেন, ইয়া রসুলাল্লাহ এ রাতে কী হয়? রসুল (সা.) বললেন, এ রাতে আগামী বছর যত শিশু জন্ম নেবে এবং যত লোক মারা যাবে তাদের তালিকা করা হয়। মানুষের বিগত বছরের সব আমল মহান আল্লাহর দরবারে পেশ করা হয় এবং এ রাতে মানুষের রিজিক অবতীর্ণ হয় (মিশকাত)।

হজরত আবু মুসা আশআরি (রা.) বলেন, রসুল (সা.) এরশাদ করেন, আল্লাহপাক শাবান মাসের ১৫তম রজনীতে সমগ্র সৃষ্টিকুলের প্রতি মনোযোগ দেন। অতঃপর সবাইকে ক্ষমা করে দেন দুই ব্যক্তি ছাড়া। তারা হলো, (১) আল্লাহর সঙ্গে শরিককারী, (২) হিংসুক। ইবনে মাজাহ।

হজরত উসমান ইবনে আবিল আস (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন : ‘যখন মধ্য শাবানের রাত আগমন করে তখন একজন আহ্বানকারী আহ্বান করতে থাকে, কোনো ক্ষমা প্রার্থনাকারী আছে কি? আমি তাকে ক্ষমা করব। কোনো যাচনাকারী আছে কি? আমি তাকে দান করব। ব্যভিচারিণী ও শিরকে জড়িত ব্যতীত যত লোক যা কিছু চাইবে সবাইকে তাদের প্রার্থনা পূরণ করে দেওয়া হবে। (বায়হাকি)

কেউ কেউ শবেবরাতের ইবাদতকে বিদআত বলেন। আবার অনেকে এ রাতের ইবাদত বন্দেগীকে ফরজ বা বাধ্যতামূলক ইবাদত মনে করেন।উভয় দলই কট্রর পন্থী। এ ক্ষেত্রে আমি মধ্যম পন্থা অবলম্বন করি। আমি এ রাতে ইবাদত করি, নফল ইবাদত। এ রাতের ইবাদতকে বিদআত মনে করি না, আবার ফরজও মনে করি না। রুটি-হালুয়া খাই, তবে ধর্মীয় বিধান মনে করি না।

আমাদের উচিত পবিত্র শবেবরাতে সারা রাত বিভিন্ন নেক আমল করে কাটিয়ে দেওয়া। জিকির করা, কোরআন তেলাওয়াত করা, নফল নামাজ পড়া। যেসব আত্মীয়-স্বজন ও প্রিয়জন পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে তাদের কবর জিয়ারত করা। নিজের কৃত গুনাহগুলোর কথা স্মরণ করে মহান পরওয়ারদেগারের দরবারে কান্নাকাটি করা। ভোর রাতে সেহেরি খেয়ে পর দিন রোজা রাখা। যেহেতু শবেবরাতের ইবাদত নফল, সেহেতু মসজিদের বদলে ঘরে আদায় করা উত্তম।

মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে শবেবরাতের তাৎপর্য অনুধাবন করে এই রাতে বেশি বেশি ইবাদত করার তৌফিক দান করুন। আমিন।

Leave a comment

XHTML: You can use these html tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>

Comment moderation is enabled. Your comment may take some time to appear.

Show Buttons
Share On Facebook
Share On Twitter
Share On Google Plus
Share On Pinterest
Share On Youtube
Hide Buttons