নিজস্ব প্রতিবেদক | সর্বশেষ আপডেট: বৃহস্পতিবার, 12th ফেব্রু., 2015

অজ্ঞেয়বাদী নাস্তিক ব্লগার সায়েমের সাথে কথোপকথন

Share This
Tags
Print Friendly

kamikazeনাস্তিক্যবাদী লেখালেখির কারনে সম্প্রতি বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার মুখে আছেন বর্তমান সময়ের অন্যতম পরিচিত ব্লগার আবু সায়েম কনক, যিনি অনলাইন জগতে কামিকাজি নামে পরিচিত এক ব্লগার। নাস্তিক্যবাদী লেখালেখির কারনে বিভিন্ন সময়ে পড়তে হয়েছে নানান ধরনের সমস্যা ও হুমকির মুখে। সম্প্রতি কথা হয়েছিলো সায়েম ওরফে কামিকাজির সাথেঃ

পোর্টাল বাংলাদেশঃ আপনার নাস্তিকতার পথে আসার গল্প আমাদের পাঠকদের সাথে শেয়ার করবেন?

সায়েমঃ আমি নাস্তিকতা গ্রহন করার আগে কখনই পরিপূর্ণ মুসলমান ছিলাম না। যেহেতু আমার পরিবার মুসলমান সেহেতু জন্মসুত্রে আমি মুসলিম ছিলাম। ধর্মীয় রীতিনীতি তেমন একটা পালন করতাম না। ২০০৯ সালে যখন লন্ডনে পড়াশুনা করতে আসি, ইংল্যান্ডের সব ধর্মের সহাবস্থান, ধর্মীয় সহনশীলতা আমাকে মুগ্ধ করে। ২০১১-১২ এর দিকে আমি যেহেতু ইসলাম ধর্মের অনুসারী ছিলাম, তাই নিজের ধর্মের প্রতি আমি আগ্রহী হয়ে উঠি এবং কোরান হাদিস পড়া শুরু করি। যখন পড়া শুরু করলাম, কুরানে এবং হাদিসগ্রন্থ সমুহতে অনেক লেখাই আমাকে চিন্তাযুক্ত করে তোলে। অনেক আয়াতে এবং হাদিসে কিছু পরস্পরবিরোধী, মানবতা বিবর্জিত, অবৈজ্ঞানিক তথ্য আমাকে ভাবিয়ে তোলে। ইন্টারনেট থেকে শুরু করে বড় মসজিদের হুজুরদের কাছ থেকেও আমার কোন প্রশ্নের যুক্তিযুক্ত উত্তর না পাওয়ার ফলে আমার মনে প্রশ্নের জন্ম নেয়। আমাকে বলা হয়, কোন সন্দেহ ছাড়াই কুরানে এবং হাদিসে যা লেখা আছে অন্ধভাবে বিশ্বাস করতে হবে। আমি ব্যাক্তিগতভাবে একজন যুক্তিবাদী এবং বিজ্ঞানমনস্ক। সুতরাং অযৌক্তিক এবং অবৈজ্ঞানিক কোন কিছুই আমার পক্ষে গ্রহন করা সম্ভব নয়। আমি কোন ভাবেই আমার প্রশ্নের যৌক্তিক উত্তির না পাওয়ার ফলে ২০১৩ সালে ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করি এবং একজন অজ্ঞেয়বাদী নাস্তিকে পরিনত হই।

পোর্টাল বাংলাদেশঃ বাংলাদেশে আস্তিক-নাস্তিকতা চর্চা এবং সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া কি?

সায়েমঃ বাংলাদেশে নাস্তিকতা একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে বিবেচিত। বাংলাদেশে আইনতভাবে এবং ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে নাস্তিকতা একটি অপরাধ এবং বাংলাদেশের ৯০ ভাগ মুসলমান হওয়ার ফলে নাস্তিকতা বাংলাদেশে বিবর্জিত। সাধারন মানুষ এখনও নাস্তিকতাকে সহজভাবে গ্রহন করতে পারেনি এবং নাস্তিকতা বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম ইসলামের বিপরীতে অবস্থান করায় নাস্তিকতা অনেকটাই ঘৃণিত এবং নাস্তিক অথবা অজ্ঞেয়বাদীরা অনেক হুমকির মুখে।

পোর্টাল বাংলাদেশঃ অনেকেই বলে থাকেন নাস্তিকরা ইসলামবিরোধী, আপনার কি মতামত?

সায়েমঃ নাস্তিকতা সব ধর্মের বিরুদ্ধেই। নাস্তিকরা সব ধর্মের বিপক্ষেই লিখে থাকেন অথবা তাদের মতামত প্রকাশ করে থাকেন। কিন্তু নাস্তিকদের মতামত অন্যন্য ধর্ম সমালোচনা হিসেবে গ্রহন করলেও ইসলাম ধর্মের বিরুদ্ধে কেউ মতামত প্রকাশ করলে তাকে হত্যার কথা বলা হয়েছে। এবং দেখা যায় যারা ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে নাস্তিক হয়েছেন, তারা তাদের প্রাক্তন ধর্ম সম্পর্কে বেশি জানেন এবং সেটি নিয়েই বেশি লিখে থাকেন। ইসলাম ধর্ম একটি অসহনশীল ধর্ম যে কারনে নাস্তিকরা এই ধর্মের বিরুদ্ধেই বেশি লিখে থাকেন। আপনি খেয়াল করবেন খ্রিস্টানদের যীশুকে নিয়ে পুরো পৃথিবীতেই অনেক মজা করা হয়ে থাকে এমনকি অন্তর্বাসেও তার ছবি থাকে, যীশুকে নিয়ে কমেডি ছবি বানানো হয়। কিন্তু খ্রিস্টানরা এটাকে সমালোচনা হিসেবে গ্রহন করে এবং নিজের বিশ্বাসে অটুট থাকে। কিন্তু শুধুমাত্র মুহম্মদের ছবি আকার কারনে প্যারিস থেকে শুরু করে সারাবিশ্বে মুসলমান সন্ত্রাসীরা নিরীহ মানুষদের হত্যা করে থাকে। ইসলাম ধর্ম এত ত্রুটি দিয়ে পরিপূর্ণ এবং  সারা বিশ্বে ইসলাম ধর্মের অনুসারীরা যেভাবে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে তাতে নাস্তিকরা অনেক লেখার উপকরন পেয়ে থাকে তাই নাস্তিকরা ইসলাম ধর্ম নিয়ে বেশী লিখে থাকেন।

পোর্টাল বাংলাদেশঃ নাস্তিকতাও কি এক প্রকার বিশ্বাস/আদর্শ?

সায়েমঃ নাস্তিকতা একটি আদর্শ যেখানে ধর্মের মিথ্যা স্বর্গের প্রলোভন থেকে মুক্ত হয়ে মানবিকতা, ভালবাসা দিয়ে পৃথিবীকেই স্বর্গে পরিনত করার চেষ্টায় আমরা অঙ্গীকারবদ্ধ।

পোর্টাল বাংলাদেশঃ নাস্তিকতা চর্চায় আপনার অভিজ্ঞতা কি ?

সায়েমঃ নাস্তিকতা গ্রহন করার আগে নিজেকে খাঁচায় বন্দী একটি ক্রীতদাস মনে হত যে অদৃশ্য এক প্রভুর ইশারায় চলত। ধর্ম ত্যাগ করার পর নিজেকে সব ধরনে বাধামুক্ত একজন নতুন মানুষ বলে মনে হয়। আমার কাছে মনে হয়েছে মুক্ত ও স্বাধীন হিসেবে নতুনভাবে আমার জন্ম হয়েছে এবং জীবনের নতুন মানে খুজে পেয়েছি।

পোর্টাল বাংলাদেশঃ নাস্তিকতা চর্চায় কি কখনো পারিবারিক সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন?

সায়েমঃ প্রথমদিকে পরিবার আমার নাস্তিকতাকে সহজভাবে গ্রহন না করলেও পরবর্তীতে আমি তাদেরকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছি যদিও তারা এখনও ইসলাম ধর্ম অনুসারী। তারা আমার নাস্তিকতাকে সহজভাবে গ্রহন করেছে এবং আমার অবিশ্বাসকে শ্রদ্ধা করে।

পোর্টাল বাংলাদেশঃ নৈতিকতা ও নাস্তিকতাকে কেন মুখোমুখি করে দেয়া হয় ?

সায়েমঃ আমার মতে, নৈতিকতা এবং নাস্তিকতা একই সমান্তরাল রেখায় অবস্থান করে। নাস্তিকতা অসত্যের বিরুদ্ধে কথা বলে, সত্যেকে উপস্থাপন করে। নাস্তিকতা সঠিককে সঠিক এবং ভুলকে ভুল বলতে শেখায়। ধর্মীয় নৈতিকতা এবং নাস্তিকতাকে মুখোমুখি করানো হয় ধর্মকে গ্রহণযোগ্য করানোর জন্য কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে ধর্মের অনৈতিকতাকে পাঁশ কাটিয়ে যাওয়া হয়।

পোর্টাল বাংলাদেশঃ নাস্তিকরা জাতীয় বিষয়ে প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের সাথে সম্পৃক্ত হতে পারেন কি?

সায়েমঃ নাস্তিকরা মনেপ্রানে চান জাতীয় বিষয়ে প্রান্তিক মানুষের সাথে সম্পৃক্ত হতে। মুসলিম দেশগুলো বাদে অন্যন্য উন্নত দেশে নাস্তিকরা জাতীয় স্বার্থ নিয়ে সরব থাকেন। এবং প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের সাথে তাদের অংশগ্রহন চোখে পড়ার মত। উদাহরন হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিল মার, জর্জ কারলিং কিন্তু স্ট্যান্ডআপ কমেডি অথবা টিভি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সাধারন মানুষের মাঝে জনপ্রিয় এবং নাস্তিকতা চর্চা করেছেন বাধাহীনভাবেই যেটা বাংলাদেশে অচিন্তনীয়।

পোর্টাল বাংলাদেশঃ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নাস্তিকতা কি বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান সমস্যা বলে মনে করেন?

সায়েমঃ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নাস্তিকতা বাংলাদেশের অন্যতম সমাধান বলে আমি মনে করি। বাংলাদেশে বেশিরভাগ মানুষ অশিক্ষিত এবং ধর্মভীরু। কিছু হাতেগোনা ধর্মভীরু তাদের উদ্দেশ্য সাধন করার লক্ষ্যে ধর্মকে ব্যবহার করে থাকে এবং তার শিকার হয় এই মানুষগুলি। তবে আশার কথা হচ্ছে দিন দিন বাংলাদেশে নাস্তিকের সংখ্যা বাড়ছে এবং মানুষ সচেতন হচ্ছে। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে নাস্তিকতাকে বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় সমস্যা বলে প্রচার করা হচ্ছে এবং এটা করছে হাতেগোনা কিছু স্বার্থান্বেষী মানুষ।

পোর্টাল বাংলাদেশঃ আস্তিকরা প্রায়শই প্রশ্ন করে থাকেন, পরকালে নাস্তিকদের কি হবে? আপনার জবাব কি?

সায়েমঃ আমরা নাস্তিকরা পরকালে বিশ্বাস করিনা এবং আদৌ পরকাল বলে কিছু আছে কিনা তার প্রমান কেউ দিতে পারেনি। মানুষের মৃত্যুর পর স্বাভাবিকভাবেই মৃতদেহ মাটিতে মিশে যাবে এবং এভাবেই একটি মানব জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটবে। আমি কাউকে মৃত্যুর পর ফিরে এসে পরকালে গল্প বলতে শুনিনি। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমার মৃত্যুর পর আমার দেহ দান করে যাব যাতে প্রতিবন্ধীরা আমার মৃত্যুর পর আমার দেহের অঙ্গ ব্যবহার করে সুস্থ জীবনে ফিরে আসতে পারে। মানব কল্যানে অনেক কিছু করার ইচ্ছা থাকলেও বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কারনে অনেক কিছু করা সম্ভব হয়ে ওঠে না তাই অন্তত আমার দেহ দানের মাধ্যমে মানবকল্যানে নিজেকে অংশীদার করে যেতে চাই।

পোর্টাল বাংলাদেশঃ বাংলাদেশে এখন বলতে গেলে প্রায়শই মুক্তমনা আর  নাস্তিকদের হত্যা করা হচ্ছে। প্রশাসনও কিন্তু তেমন কোন ব্যবস্থা নিচ্ছে না। আপনি কি একে প্রশাসনিক ব্যর্থতা বলবেন?

সায়েমঃ অবশ্যই। মুক্তমনা ও নাস্তিকদের নির্মমভাবে হত্যা করার পর প্রশাসনের নীরব ভুমিকা প্রমান করে দেয় সাধারন জনগনের নিরাপত্তার ব্যাপারে সরকার কতটা উদাসীন। উল্টো আইন প্রনয়ন করে মত প্রকাশের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ধর্ম নিয়ে কেউ লেখালেখি করার ফলে খুন হলে সরকার তার দায়িত্ব নেবে না উল্টো মুক্তমনা লেখকদের জেল জরিমানার আইন করা হয়েছে। সরকার ও পুলিশ প্রশাসন, ব্লগার ও লেখকদের নিরাপত্তার ব্যাপারে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ।

পোর্টাল বাংলাদেশঃ আস্তিকরা কি নাস্তিকদের সাথে শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করতে পারেন?

সায়েমঃ অবশ্যই, নাস্তিকরা আস্তিকদের সাথে শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করতে পারেন। উন্নত দেশগুলির দিকে তাকালেই আপনি এর উদাহরন দেখতে পাবেন। নাস্তিকদের এবং আস্তিকদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকতেই পারে তবে শান্তিপূর্ণ ডিবেট অথবা আলোচনা করা যেতে পারে এবং সবার বিশ্বাসের প্রতি সহনশীলতা প্রয়োজন।

পোর্টাল বাংলাদেশঃ আপনার অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশে নাস্তিকদের এখন কি অবস্থা?

সায়েমঃ বাংলাদেশে নাস্তিকদের অবস্থা অনেক হুমকিসম্পন্ন। একের পর এক নাস্তিক হত্যা করার ফলে নাস্তিকরা অনেক অসহায় এবং নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। অনেকেই অনলাইনে নিজের নাম এবং পরিচয় গোপন রাখছেন এবং আশঙ্কায় আছেন। অনেকেই দেশে ছেড়ে চলে যাওয়ার চেষ্টা করছেন , কেউ কেউ চলে গিয়েছেন ইতিমধ্যে। যারা বাইরে আছেন, তারা দেশে ফিরে যেতে পারছেন না।

পোর্টাল বাংলাদেশঃ বাংলাদেশের মতো রক্ষণশীল দেশে নাস্তিকতা যারা চর্চা করেন তাদের জন্য কি পরামর্শ দেবেন ?

সায়েমঃ যারা বাংলাদেশে লেখালেখি করছেন তাদের অনুরোধ করব যতটা সম্ভব নিরাপদ থাকার চেষ্টা করুন। ইন্টারনেটে নিজের পরিচয় প্রদান থেকে বিরত থাকুন। আহমেদ রাজিব হায়দার এবং নিলয় নীল নিজেদের পরিচয় গোপন রেখে ব্লগিং করার পরেও ইসলামী সন্ত্রাসীরা তাদের বাসায় গিয়ে তাদের হত্যা করে। যতটা সম্ভব নিজেদের পরিচয় গোপন রাখার চেষ্টা করুন অফলাইনে এবং অনলাইনে। টর ব্রাউজার ব্যাবহার করুন, নিজের অবস্থান অথবা নিজের নাম দিয়ে ব্লগিং করবেন না পারলে অন্য নিক ব্যাবহার করুন। যতটা সম্ভব নিরাপদ থাকুন।

পোর্টাল বাংলাদেশঃ সায়েম আপনাকে অনেক ধন্যবাদ আমাদের সাথে থাকার জন্য এবং শত ব্যস্ততার মধ্যেও সাক্ষাৎকার দেবার জন্য। পোর্টাল বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আপনাকে অনেক অভিনন্দন।

সায়েমঃ আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ।

Show Buttons
Share On Facebook
Share On Twitter
Share On Google Plus
Share On Pinterest
Share On Youtube
Hide Buttons