নিজস্ব প্রতিবেদক | সর্বশেষ আপডেট: বৃহস্পতিবার, 13th নভে., 2014

সংগ্রামী নারী : জয়নাব আল গাজালী

Share This
Tags
Print Friendly

time-3

লেখিকাঃ হাফিজা তাহিরা হ্যাপী
জয়নাব আল গাজালী আল জুবাইলী বিশ শতকের একজন সংগ্রামী নারীর নাম। তিনি তাঁর জীবন উৎসর্গ করেছিলেন মানুষকে হইকালীন ও পরকালীন মুক্তির পথ দেখানোর দায়িত্ব পালনের জন্য। তিনি মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন ইসলামের আলোকে মানবজীবনের সকল সমস্যার সমাধানের মাধ্যমে মানুষকে দুনিয়ায় ক্ষুধামুক্ত সমৃদ্ধ জীবন এবং পরকালীন চির-শান্তির নিবাস জান্নাতের পথ দেখানো প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর দায়িত্ব। আধুনিককালে বিশ্বব্যাপী ইসলামী জাগরণে ভূমিকা পালনের জন্য যে কয়েকজন মুসলিম নারীর নাম ইতিহাসের পাতায় সোনালি অক্ষরে লেখা থাকবে জয়নাব আল গাজালী আল জুবাইলী তাঁদের অন্যতম।

জয়নাব আল গাজালী আল জুবাইলী জন্ম ১৯১৭ সালের ২ জানুয়ারি মিসরের বিহারা প্রদেশের মাইতিন গ্রামে। ছোট বেলায় বাসায় ইসলামী শিক্ষার পাশাপাশি পাবলিক স্কুলে যান এবং পরে হাদিস ও ফিকাহ্ শাস্ত্রে সার্টিফিকেট লাভ করেন। তিনি আল আজহারের প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ শেখ আলী মাহফুজ ও মোহাম্মাদ আল নাসারের কাছে শিক্ষা লাভ করেন।

স্বৈরশাসকের রক্তচক্ষু, নিষ্ঠুর নির্যাতন অথবা অর্থ-ক্ষমতার লোভ কোনো কিছুই তাকে তাঁর পথ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। অল্প বয়সে তিনি ইসলামকে জীবনের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন এবং এই আদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন শুরু করেছিলেন। ইন্তিকালের আগ পর্যন্ত তিনি তাঁর উপর পর্বতের মতোই অবিচল ছিলেন । তার বক্তৃতা চুম্বকের মতো মানুষকে আকৃষ্ট করত এবং তিনি হাজার হাজার মানুষকে বক্তৃতা দ্বারা প্রভাবিত করতে পারতেন। এমনকি জেলে চরম নির্যাতনের মুখে তার ক্ষুরধার সত্যভাষণে অত্যাচারীরা হতবাক হয়ে যেত। শুধু সুবক্তাই নয়, তিনি ছিলেন একজন সুপণ্ডিত লেখিকা, যোগ্য সংগঠক ও সমাজসেবী।

মাত্র ১৮ বছর বয়সে ১৯৩৬ সালে জয়নাব আল গাজালী ‘জমিয়াত আল সাইয়্যেদাত আল মুসলিমাত’ (মুসলিম ওমেন্স এসোসিয়েশন) নামে সংগঠন গঠন করেন। অবশ্য এর আগে তিনি ১৯৩৫ সালে হুদা শারাভির ‘ইজিপশিয়ান ফেমিনিস্ট ইউনিয়ন’ নামের একটি সংগঠনে যোগদান করেছিলেন। কিন্তু এ সংগঠনের নীতি ও আদর্শের সাথে একমত হতে না পেরে এক বছর পরই তিনি সেই সংগঠন থেকে পদত্যাগ করেন। এরপর ঐ বছরই নিজের সংগঠনটি গঠন করেন। এ সংগঠনের সদস্য সংখ্যা ১৯৬৪ সালের মধ্যে প্রায় ৩০ লাখে পৌঁছে যায়। তিনি মহিলাদের উদ্দেশ্যে প্রতি সপ্তাহে ‘ইবনে তুলুন’ মসজিদে বক্তৃতা করতেন, যেখানে প্রায় তিন হাজার মহিলা জমায়েত হতো। রমজানের সময় এ সংখ্যা পাঁচ হাজার ছাড়িয়ে যেত। ইসলামী দাওয়াত এবং শিক্ষা প্রসারের পাশাপাশি তার এসোসিয়েশন নানা সামাজিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করত। সাধারণ জনগণকে তাদের কাজের প্রতি আকৃষ্ট করার জন্য পত্র-পত্রিকা ও ম্যাগাজিন প্রকাশ করতেন। অসহায় মা-বাবা হারা শিশুদের মানুষের মতো মানুষ হিসেবে গড়ার জন্য এতিমখানা পরিচালনা করতো। তিনি দারিদ্র্য দূর করার জন্য সমাজ কল্যাণমূলক কর্মসূচি গ্রহণ করেছিলেন। এই কর্মসূচির মাধ্যমে দরিদ্র অসহায় পরিবারগুলোকে সহায়তা প্রদান করতেন। জয়নাব ওয়াক্ফ মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় ১৫টি মসজিদ স্থাপন করেছেন। এছাড়াও সংগঠনের ও নিজের উদ্যোগে অনেক মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেছেন।

জয়নাব আল গাজালীর চিন্তা ও কাজ ইখওয়ানুল মুসলিমিনের প্রতিষ্ঠাতা (১৯২৮) হাসান আল বান্নার (১৯০৬-১৯৪৯) দৃষ্টি কাড়ে। এসোসিয়েশন গঠনের ছয় মাসের মধ্যে ১৯৩৭ সালে জয়নাব ইখওয়ানের হেডকোয়ার্টারে সমবেত মহিলাদের উদ্দেশ্যে বক্তৃতা করতে গেলে ইখওয়ানুল মুসলিমিনের প্রতিষ্ঠাতা মুর্শীদে আম হাসান আল বান্নার সাথে তাঁর দেখা হয়। তখন হাসান আল বান্না আল ইখওয়ানের মহিলা শাখা ‘আল-আখওয়াত আল মুসলিমাত’ গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। তিনি জয়নাবকে আল-আখওয়াতের নেতৃত্ব দেয়ার অনুরোধ জানান। এ প্রস্তাবের অর্থ ছিল ইখওয়ানের সাথে মুসলিম ওমেন্স এসোসিয়েশনের একীভূত হয়ে যাওয়া। যদিও হাসান আল বান্নার সাথে তাঁর চিন্তা চেতনার একাত্মতা ছিল কিন্তু তার পরও তিনি মুসলিম ওমেন্স এসোসিয়েশনের স্বকীয়তা বজায় রাখতে চাচ্ছিলেন। ফলে জয়নাব এসোসিয়েশনের জেনারেল এ্যাসেম্বলির সাথে পরামর্শ করে এ প্রস্তাব নাকচ করে দেন। এ প্রসঙ্গে ডেনিস জে সুলিমান এবং সানা আবেদ কুতুব ‘জয়নাব আল গাজালী : ইসলামিস্ট ফেমিনিস্ট ?’ প্রবন্ধে লিখেন, “হাসান আল বান্নার মতো নেতার প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয়া থেকে বোঝা যায় জয়নাব ছিলেন স্বাধীন চেতা এবং তার লক্ষ্য উদ্দেশ্যের প্রতি একাগ্রচিত্ত ও নিবেদিতপ্রাণ।”

অবশ্য একীভূত হওয়ার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলেও তিনি ও তাঁর এসোসিয়েশনের সদস্যরা বান্নার সাথে পরিপূর্ণ সহযোগিতা করার আশ্বাস দেন। পৃথক অস্তিত্ব থাকলেও তাঁদের মধ্যে পারষ্পারিক সহযোগিতা ও যোগাযোগের কোনো কমতি ছিলনা। অবশ্য হাসান আল বান্না সবসময়ই একত্রিত হওয়ার প্রতি গুরুত্ব দিতেন। তারপরও ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত জয়নাব তার সংগঠনের দায়িত্ব পালনের সাথে সাথে ইখওয়ানের মহিলা শাখাকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেন। কিন্তু ১৯৪৮সালে আরব ইসরাইল যুদ্ধের পর ঔপনিবেশিক শক্তি ইখওয়ানকে দমন করার সিদ্ধান্ত নেয় যে সকল ইখওয়ান সদস্য যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন তাদের বন্দী করে। ইখওয়ানকে নিষিদ্ধ এবং তহবিল বাজেয়াপ্ত করে। ইখওয়ানের প্রতি এমন অন্যায় আচরণে জয়নাবের মনে দারুণ প্রভাব ফেলে। তিনি হাসান আল বান্নার প্রস্তাবের গুরুত্ব উপলব্ধি করেন। জয়নাবের নিজের ভাষায় “ইখওয়ানকে নিষিদ্ধ ঘোষণার পরবর্তী দিনই আমি দলের কেন্দ্রীয় দফতরে আমার জন্য নির্দিষ্ট কক্ষে উপস্থিত হই। এই সেই কক্ষে যেখানে আল বান্নার সাথে শেষ বার আমার আলাপ হয়েছিল …আমি আমার কান্না চেপে রাখতে পারলাম না। আমার বিশ্বাস জন্মালো আল বান্নার কথাই ঠিক। তিনিই সেই নেতা, যার পেছনে কাজ করতে আমাদের প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়া উচিৎ … আমার নিজের চাইতে আল বান্নাকে অনেক বেশি শক্তিশালী মনে হলো।… তার মতো এমন সাহস সকল মুসলমানের থাকা উচিৎ …।”

এর কিছুদিনের মধ্যেই জয়নাব আল গাজালী আল বান্নার সাথে দেখা করে আনুগত্যের শপথ করেন। হাসান আল বান্না শপথ গ্রহণ করে বলেন, “তবে মুসলিম ওমেন্স এসোসিয়েশন আপাতত যেভাবে কাজ করছে সেভাবেই করতে থাকুক।”

বান্না তার উপর প্রথমেই আল নাহাসের সাথে মধ্যস্থতা করে দেয়ার দায়িত্ব দেন। মুস্তফা আল নাহাস (১৮৭৬ – ১৯৬৫) ন্যাশনালিস্ট ওয়াফ্দ পাটির নেতা ছিলেন। ১৯৫২ এর পট পরিবর্তনের আগ পর্যন্ত তিনি মিসরের রাজনীতিতে অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন। তিনি পাঁচবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। তাঁর সাথে জয়নাব নিজের পরিচয় সূত্রকে কাজে লাগিয়ে ইখওয়ানের সাথে ওয়াফ্দ পাটির যোগাযোগ স্থাপনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। আনুগত্যের শপথ নেয়ার ঘটনার অল্প কিছুদিন পরই ১৯৪৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি হাসান আল বান্নার শাহাদাতের ঘটনা ঘটে। হাসান আল বান্নার প্রতি জয়নাবের আনুগত্যের শপথ নেয়ার বিষয়টি সাংগঠনিকভাব্ েতখনও প্রকাশিত হয়নি।

ওয়াফ্দ পার্টি সরকার গঠন করার পর হাসান আল হুদায়বীর নেতৃত্বে ইখওয়ান আবার কাজ শুরু করে। তখন জয়নাব তাঁর আনুগত্যের শপথের কথা প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি আল হুদায়বীর দফতর সাজানোর জন্য তার ঘরের সবচেয়ে প্রিয় ফার্নিচারটি উপহার দেন। অল্প কিছু দিনের মধ্যেই আব্দুল কাদির আওদাহ জয়নাবের সাথে সাক্ষাৎ করে তার উপহারের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, “এটা আমাদের আনন্দিত করবে যদি জয়নাব আমাদের একজন হয়ে যান।” জবাবে জয়নাব বলেন, “আমি আপনাদের একজন হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করি।” আব্দুল কাদির আওদাহ বলে উঠেন, “আলহামদুলিল্লাহ আপনি ইতোমধ্যেই আমাদের একজন।”

ইখওয়ানে আনুষ্ঠানিক যোগদানের পরও অবশ্য জয়নাব তাঁর মুসলিম ওমেন্স এসোসিয়েশনকে আলাদা সংগঠন হিসেবেই রাখেন। ১৯৬৪ সালে নাসের সংগঠনটি নিষিদ্ধ না করা পর্যন্ত এর কাজ এভাবেই চলতে থাকে। জয়নাব আল গাজালী ১৯৫৪ সালের পর ইখওয়ানের সঙ্কটকালে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৫৪ সালে তৎকাীলন প্রেসিডেণ্ট জামাল আব্দুন নাসের ইখওয়ানের প্রথম সারির সকল নেতাকে গ্রেফতার করে। প্রহসনের বিচারের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের মৃত্যুদণ্ড দেয়। মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্তদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুজন নেতা হলেন আব্দুল কাদির আওদাহ এবং শেখ মুহাম্মদ ফারগিল। মুর্শীদে আম হাসান আল হুদায়বিরও মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়েছিল নাসের। ঘটনাক্রমে তাঁর হার্ট এটাক হওয়ায় পরে আর তা কার্যকর হয়নি। কিন্তু তিনি মুক্তি পাওয়ার পর বয়স এবং শারিরীক অসুস্থতার জন্য নেতৃত্ব দানে সক্ষম ছিলেন না। এমন কঠিন সঙ্কটময় সময়ে সাইয়্যেদ কুতুব, জয়নাব আল গাজালী এবং আব্দুল ফাত্তাহ ইসমাঈল সেই শূণ্যতা পূরণে ভূমিকা রাখেন। সাইয়্যেদ কুতুব কারাগারের ভেতর থেকে গাইড হিসেবে কাজ করেন। জয়নাব আল গাজালী এবং আব্দুল ফাত্তাহ ইসমাঈল, মুর্শীদে আম হাসান আল হুদায়বির সম্মতিতে সমস্ত কাজ পরিচালনা করেন।

তারা নিষিদ্ধের পর কাজ করার সুযোগ পেয়ে দল পুনঃগঠনের কর্মপন্থা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। তারা এই সিদ্ধান্তে একমত হন যে, সবার আগে মুসলমানদেরকে মূল আকীদায় ফিরিয়ে আনার কর্মসূচি নিতে হবে। তারা তরুণদের মন ও মনন গঠনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। এজন্য তাঁরা গবেষণা করে কতকগুলো বইয়ের তালিকা তৈরি করেন। যাঁরা এই কাজের জন্য প্রস্তুত তাদেরকে খুঁজে বের করে একত্রিত করার পরিকল্পনা করেন।

হাসান আল হুদায়বি অনুমতি নিয়ে তারা প্রথমে জরিপ কাজ শুরু করেন। এ উপলক্ষে আব্দুল ফাত্তাহ ইসমাঈল সারা মিসরের প্রতিটি জেলা, উপজেলা শহর, গ্রাম সফর করেন। ১৯৫৯ সালে সম্পূর্ণ গবেষণা শেষ করে জয়নাব তাদের ‘এডুকেশনাল প্রোগামকে ’ চূড়ান্ত রূপ দেন।

১৯৬২ সালে জয়নাব এবং ফাত্তাহ সাইয়্যেদ কুতুবের সাথে কারাগারে যোগাযোগ করতে সমর্থ হন। তারা তাদের নির্ধারণ করা বইয়ের তালিকাটি সাইয়্যেদ কুতুবকে দেন। সাইয়্যেদ তালিকার ব্যাপারে পরামর্শ দেন। তিনি কারাগারে বসে তাঁর লেখা বই ‘মা’লিম ফিততারিক’ তাঁদের হাতে দেন। সাইয়েদ কুতুবের লেখা এই বইটির ইংরেজি অনুবাদ ‘মাইলস্টোন’ এবং বাংলায় ‘ইসলামী সমাজ বিপ্লবের ধারা’। তারা এই বইটিসহ তালিকাভুক্ত বইয়ের পাঠচক্র শুরু করেন। তাঁদের পাঠচক্র তরুণ সমাজের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলে। সাইয়্যেদ কুতুবের পরামর্শে তারা ঠিক করেন এই পাঠচক্র তের বছর চালাবেন। যদি ৭৫ ভাগ মানুষ ইসলামের পক্ষে মত দেয় তবে তারা ইসলামী রাষ্ট্রের ডাক দেবেন। আর যদি এরচেয়ে কম মানুষ মত দেয় তাহলে তারা পাঠচক্র আরও তের বছর চালাবেন এবং আবার জরিপ করবেন। এভাবে চলতে থাকবে। ’৫৪ সালে ইখওয়ানের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের কারণে তারা তাদের এই তৎপরতা গোপন রাখার সিদ্ধান্ত নেন। যদিও তাদের এই কর্মসূচি ছিলো শান্তিপূর্ণ তারপরও প্রেসিডেন্ট জামাল আব্দুন নাসেরের রোষানলে পড়ে যায়।

১৯৬৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে গাড়ি চাপা দিয়ে জয়নাবকে হত্যার ব্যর্থ চেষ্টা করা হয়। তার উরুর হাড় ভেঙ্গে যায়। হত্যা প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর নাসের বিভিন্ন ভাবে জয়নাবকে প্রলোভিত করে, হুমকি দিয়ে তাকে তার কাজ থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু জয়নাব ছিলেন তার কাজে অবিচল, নির্ভীক।

১৯৬৫ সালের আগস্টে নাসের মরিয়া হয়ে ওঠে। জয়নাবের নিজের ভাষায়, “বস্তুত: ওরা মনে করেছিল আমাদের এটা ভাববাদী আন্দোলন। এর নেতৃত্ব দিচ্ছেন কারাবন্দী নেতা সাইয়েদ কুতুব। আর বাইরে এর বাস্তব অনুশীলন করছেন আব্দুল ফাত্তাহ ইসমাঈল এবং জয়নাব আল গাজালী। … এমন সময় আমরা অত্যন্ত বিশ্বস্ত সূত্রে এ তথ্য পাই যে, ইখওয়ানুল মুসলিমীন এবং তার সব তৎপরতাকে অবিলম্বে খতম করার জন্য মার্কিন ও সোভিয়েত গোয়েন্দা সংস্থ প্রেসিডেণ্ট নাসেরকে একটি রিপোর্ট হস্তাান্তর করে। রিপোর্টে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয় যে, অবিলম্বে ইখওয়ানকে স্তব্ধ না করলে নাসের সরকার জনগণকে ইসলাম থেকে দূরে সরিয়ে আনার ব্যাপারে যে সাফল্য অর্জন করেছে তা ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। … ১৯৬৫ সালের আগস্ট মাসের গোড়ার দিকে আমি খবর পাই যে, অবিলম্বে যাদের গ্রেফতার করা হবে তাদের তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। তালিকার কয়েকজন হচ্ছে – সাইয়েদ কুতুব, জয়নাব আল গাজালী, আব্দুল ফাত্তাহ ইসমাঈল এবং মোহাম্মদ ইফসুফ হাওয়াস”। আগস্টেই নাসের লাখ লাখ ইখওয়ান নেতা কর্মী গ্রেফতার করে। ১৯৬৫ সালের ২০ আগস্ট জয়নাব আল গাজালী গ্রেফতার হন। গ্রেফতারের কারণ হিসেবে নাসেরকে ‘হত্যা প্রচেষ্টা’র ষড়যন্ত্রের কথা প্রচার করা হয়। কিন্তু ইখওয়ানের প্রতি নাসেরের ক্রোধের আসল কারণ জয়নাবের ভাষায়,“ নাসের নাস্তিক্যবাদ ও অশ্লীল ছায়াছবি, পত্র পত্রিকা আমদানী করে দেশের নবীন বংশধরদের চরিত্র হননের আপ্রাণ চেষ্টা করে …। ইসলামী আন্দোলনে তরুণদের প্রধান ভূমিকা দেখে নাসের ক্ষেপে পাগল হয়ে পড়ে। সে তার সাঙ্গ পাঙ্গদের প্রায়ই বলতো, “জয়নাব আল গাজালী এবং আব্দুল ফাত্তাহ ইসমাঈল তরুণ সম্প্রদায়কে আমার হাত থেকে কেড়ে নিয়েছে।” নাসেরের এই স্বীকৃতি আমাদের জন্য গৌরবের কথা। তার নির্লজ্জ কঠোর থাবা থেকে আমরা তরুণ সম্প্রদায়কে বাঁচিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছি। … এমন তরুণ বাহিনী সৃষ্টি করে দিয়েছি, যারা যুগের যে কোনো হুযুগের মোকাবেলায় ইসলামের ঝাণ্ডাকে বুলন্দ রাখতে সক্ষম।” ১৯৬৫ সালের ২০ আগস্ট গ্রেফতারের পর জয়নাবকে সামরিক কারাগারে নেয়া হয়। সেখানে তাঁর ওপর নির্মম নির্যাতন চালানো হয় । তিনি এ নির্যাতনের কাহিনী তাঁর ‘আইয়্যাম মিন হায়াতি’ ইংরেজি অনুবাদ ‘Return of the pharaoh’ এবং বাংলায় ‘কারাগারের রাতদিন’ বইয়ে বর্ণনা করেছেন।

১৯৬৬ সালের ১৭ মে প্রহসনের বিচারের পর, নাসেরকে হত্যা চেষ্টার অভিযোগ এনে জয়নাব আল গাজালীকে ২৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড, সাইয়্যেদ কুতুব, আব্দুল ফাত্তাহ ইসমাঈল এবং মোহাম্মদ হাওয়াসকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়।

১৯৭১ সালের ১০ আগস্ট আনোয়ার সাদাত ক্ষমতা দখলের পর জয়নাব আল গাজালী মুক্তি পান। ২০০৫ সালের ৩ আগস্টে জয়নব আল গাজালী ইন্তিকাল করেন।

Leave a comment

XHTML: You can use these html tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>

Comment moderation is enabled. Your comment may take some time to appear.

Show Buttons
Share On Facebook
Share On Twitter
Share On Google Plus
Share On Pinterest
Share On Youtube
Hide Buttons