নিজস্ব প্রতিবেদক | সর্বশেষ আপডেট: শনিবার, 8th নভে., 2014

জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস

Share This
Tags
Print Friendly

time-1

মোঃ শাহাবুদ্দীন
সম্পাদক

আজ ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর। জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস। সিপাহী ও জনতার মিলিত বিপ্লবে চার দিনের দুঃস্বপ্ন শেষ হয়। ১৯৭৫ সালের এই দিনে সংঘটিত হয়েছিল সিপাহি-জনতার এক ঐতিহাসিক বিপ্লব। এই দিনে সিপাহি-জনতার মিলিত বিপ্লবে প্রতিহত হয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ববিরোধী ষড়যন্ত্র। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এ দিনটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সিপাহি-জনতার ঐতিহাসিক এ বিপ্লব দেশের তৎকালীন রাজনীতির গতিধারা পাল্টে দিয়ে দেশ ও জাতিকে নতুন পরিচয় দিয়েছিল। এদিন সিপাহি-জনতা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ক্যান্টনমেন্টের বন্দীদশা থেকে মুক্ত করে আনেন স্বাধীনতার ঘোষক মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে।

বি এন পি ও জামাতে ইসলামীসহ সমমনা রাজনৈতিক দলগুলো আজকের দিনটি ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে পালন করছে। এছাড়া জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) ও জেএসডিসহ কয়েকটি সংগঠন দিনটি পালন করছে ‘সিপাহি জনতার অভ্যুত্থান’ হিসেবে।

৭ নভেম্বর ভোররাতে জেনারেল খালেদ মোশারফ বীরউত্তম, কর্নেল হুদা বীরবিক্রম ও কর্নেল হায়দার বীরউত্তম নির্মভাবে নিহত হয়েছিলেন। এছাড়া কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে সৈনিক সংস্থার বিপদগামী সৈনিকদের হাতে আরও ১১-১২ জন টগবগে তরুণ লে. ক্যাপ্টেন নিহত হয়েছিলেন। আরও নিহত হয়েছিলেন সিএমএইচ-এ কর্তব্যরত একজন কর্নেল পদমর্যাদার মহিলা ডাক্তার। সেক্টর কমান্ডার ওসমান সাহেবের স্ত্রী।

তিনজন বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধাকে কেন্দ্র করেই রচিত হয়েছে ৭ নভেম্বরের অধ্যায়। ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ, কর্নেল শাফায়াত জামিল এবং সামরিক বাহিনী প্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান।ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর এক সামরিক অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেন। তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন কর্নেল শাফায়াত জামিল। সশস্ত্র বাহিনী বঙ্গভবন ব্যতীত প্রত্যেকটা গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থান গ্রহণ করে। সামরিক বাহিনী প্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে পদচ্যুত এবং বন্দী করা হয়। খালেদ নিজেকে মেজর জেনারেল পদে উন্নীত করে সামরিক বাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। খন্দকার মোশতাক আহমদ পদত্যাগ করলে তিনি বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি এ এস এম সায়েমকে রাষ্ট্রপতি পদে নিয়োগদান করেন। মন্ত্রিপরিষদ বাতিল করেন। জাতীয় সংসদ ভেঙে দেন। বাংলাদেশে সর্বপ্রথম সামরিক শাসন জারি করেন। তিনি মেজর হাফিজের মাধ্যমে ১৫ আগস্ট অভ্যুত্থানকারী মেজরদের সঙ্গে এক ধরনের বোঝাপড়া করেন। স্থির হয়, তখনও বঙ্গভবনে অবস্থানকারী ১৫ আগস্টে অভ্যুত্থানকারী মেজররা ৪ নভেম্বর নিরাপদে দেশত্যাগ করবেন। অস্ত্রশস্ত্র তখন ক্যান্টনমেন্টে ফেরত আসবে। ৪ নভেম্বর মেজররা দেশত্যাগ করলেন বটে, কিন্তু তার আগে ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী চারজন জাতীয় নেতাকে নির্মমভাবে হত্যার পর। খালেদ মোশাররফ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সারাদেশে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেন।

14152131087-november

তার এ অভ্যুত্থান কিন্তু ছিল অত্যন্ত স্বল্পকাল স্থায়ী। মাত্র চারদিনের মাথায় ৭ নভেম্বর অনুষ্ঠিত সিপাহী-জনতার বিপ্লবে খালেদ মোশাররফের সব পরিকল্পনার অবসান ঘটে। সিপাহী-জনতার বিপ্লবের গভীরতায় তিনি হন হতচকিত। ঢাকা ত্যাগ করার সময় শেরেবাংলা নগরের উপকণ্ঠে বিপ্লবী সৈনিকদের দ্বারা তিনি হন নিহত। পরবর্তী পর্যায়ে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান ক্ষমতাসীন হলেন। খালেদ মোশাররফ একজন কৃতী মুক্তিযোদ্ধা। ২ নং সেক্টরে তারই নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়। তার নামের আদ্যাক্ষর ধারণ করেই কে-ফোর্স (K-Force) সংগঠিত। তার মতো একজন মুক্তিযোদ্ধা সামরিক অভ্যুত্থান ঘটাতে কেন গেলেন? অভ্যুত্থানে তার লক্ষ্য কী ছিল? তিনি কী পেতে চেয়েছিলেন?

৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর একটি উচ্চাভিলাষী দল অভ্যুত্থান ঘটালে সাধারণ জনগণ ও সিপাহিদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করে। জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীর সর্বমহলে বিশেষত সিপাহিদের কাছে ছিলেন খুবই জনপ্রিয়। ফলে তারা পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ ও জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। ৬ নভেম্বর মধ্যরাতে ঘটে সিপাহি-জনতার ঐক্যবদ্ধ এক বিপ্লব-যা ইতিহাসে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে স্থান লাভ করেছে।

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর তদানীন্তন দৈনিক বাংলার রিপোর্টে বিপ্লব সম্পর্কে বলা হয়- সিপাহী ও জনতার মিলিত বিপ্লবে চার দিনের দুঃস্বপ্ন শেষ হয়েছে। মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান বন্দীদশা থেকে মুক্ত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার রাত প্রায় ১টায় সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী, নৌবাহিনীর সিপাহী-জওয়ানরা বিপ্লবী অভ্যুত্থান ঘটিয়েছেন। ষড়যন্ত্রের নাগপাশ ছিন্ন করে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে উদ্ধার করেছেন বিপ্লবী সিপাহীরা।
এ সময় রাজনৈতিক দল জাসদ ছিল নিষিদ্ধ। এরা কাজ করছিল বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা এবং বিপ্লবী গণবাহিনীর আবরণে। একটি ব্যাপারে ডান ও বাম উভয় রাজনৈতিক দলই একমত ছিল। আর তা হচ্ছে, খালেদ মোশাররফ একজন বিশ্বাসঘাতক, ভারতের দালাল এবং সে ঘৃণিত বাকশাল ও মুজিববাদ ফিরিয়ে আনতে চাইছে। বামপন্থী জাসদ ১৯৭৫ সালের ৫ ও ৬ নভেম্বর ক্যান্টনমেন্টসহ সারা শহরে ছড়য়িে দলিো হাজার হাজার প্রচারপত্র। জাসদ এক ধাপ আরও এগিয়ে গেল। তারা বলল, সিনিয়র অফিসাররা নিজেদের স্বার্থে জওয়ানদের ব্যবহার করছে। সাধারণ মানুষ ও জওয়ানদের ব্যাপারে কোনো মাথাব্যথা নেই। গণজাগরণের ডাক দিয়ে জাসদ ১২টি দাবি পেশ করে। এগুলোর মধ্যে ছিল-ব্যাটম্যান প্রথা বাতিল করতে হবে, অফিসারদের ব্যক্তিগত কাজে সৈন্যদের ব্যবহার করা চলবে না, পোশাক ও পদমর্যাদার ক্ষেত্রে জওয়ান ও অফিসারদের ব্যবধান দূর করতে হবে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে, সব রাজবন্দিকে মুক্তি দিতে হবে। জাসদের দাবিগুলো সে সময়ে তাৎক্ষণিকভাবে সৈনিকদের সমর্থন আদায়ে সক্ষম হলো।জাসদের এই দাবিনামা এবং গণঅভ্যুত্থানের ডাক দেয়ার পেছনে যে ব্যক্তিটি কাজ করছিলেন-তিনি হলেন সাবেক আর্মি অফিসার লে. কর্নেল (অবসরপ্রাপ্ত) আবু তাহের। তিনিই প্রথম জওয়ানদের মধ্যে ‘ওরা এবং আমরা’ এই ধারণার সৃষ্টি করান এবং অফিসারদের বিরুদ্ধে জওয়ানদের মাথা তুলে দাঁড়াতে সাহায্য করেন।

জেনারেল জিয়াউর রহমান রেডিও বাংলাদেশে এক সংক্ষিপ্ত ভাষণে ঘোষণা করেন, তিনি সাময়িকভাবে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন। সেনাবাহিনীর অনুরোধে এবং দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়েই তিনি এ দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তিনি বলেন, সাধ্য অনুযায়ী তিনি তার কর্তব্য পালন করবেন। দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য তিনি সবাইকে ঐক্যবদ্ধ এবং কঠোর পরিশ্রম করার আহ্বান জানান। তিনি অবিলম্বে সবাইকে কাজে যোগ দেয়ারও নির্দেশ দেন।

Leave a comment

XHTML: You can use these html tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>

Comment moderation is enabled. Your comment may take some time to appear.

Show Buttons
Share On Facebook
Share On Twitter
Share On Google Plus
Share On Pinterest
Share On Youtube
Hide Buttons