নিজস্ব প্রতিবেদক | সর্বশেষ আপডেট: মঙ্গলবার, 18th নভে., 2014

ভাষা একটাই- 'যৌনতা'

Share This
Tags
Print Friendly

মাসুদ হাসান উজ্জ্বল ॥

ছুটির দিন, বিনোদন জগত এর হালহকিকত দেখতে বসেছিলাম । সে শিল্প কলার ছাত্র হওয়ার কারণে হোক , নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের হওয়ার কারনেই হোক , কিংবা নিজে চলচ্চিত্র কর্মী হওয়ার কারণেই হোক, সহজ চোখে নিছক বিনোদন মেনে নিয়ে কিছু দেখা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। কিছু দেখতে বসলে আমার পর্যবেক্ষণের চোখ গোয়েন্দার মতো সজাগ হয়ে ওঠে, শুরু হয়ে যায় হিসেবনিকেশ ! নাটক, বিজ্ঞাপন, চলচ্চিত্র সব কিছুতেই তীব্রভাবে একটা ভাষার উপস্থিতি দেখতে পাই আজকাল- সেটা হোল যৌনতার ভাষা !

একটি বিজ্ঞাপনে একজনকে গৃহিণীর চরিত্রে অভিনয় করতে দেখলাম । যিনি অভিনয় করছেন তিনি স্বামীর সঙ্গে কথা বলার সময় ঠোঁটে এমন কোনও ভঙ্গি করলেন যাতে তার স্বাভাবিক কথাতেও একটু যৌনতা ভেসে উঠল ! এরপরে গৃহিণী যখন সন্তানের সঙ্গে কথা বললেন সেখানেও ঠোঁটের একই কারিশমা, সুতরাং শিশু সন্তানের সাথে মাতৃসুলভ একটি সংলাপে অদ্ভুতভাবে যৌনতা ঢুকে গেল! সব থেকে মজার ঘটনা ঘটলো গৃহিণী যখন লেন্সের দিকে তাকিয়ে দর্শকদের উদ্দেশে পণ্যের গুনাগুণ বলছেন , সেখানেও অগণিত দর্শকদের প্রতি যৌনতা মিশ্রিত ঠোঁটের কারুকাজ! প্রভু রক্ষা কর আমাকে, পণ্যটি কোন জন্ম নিরোধক কিংবা সুগন্ধির নয়, দুধের বিজ্ঞাপন! প্রশ্ন হলো এখানে যৌনতা আসার অবকাশ কোথায়!

নিজের একটা অভিজ্ঞতা বলি- খুবই গভীর একটা সামাজিক বিষয়বস্তু নিয়ে গিয়েছি টেলিছবি বানাতে, অভিনেতা অভিনেত্রী সবাই খুব সিরিয়াস, খুব ভালো করতে হবে । মুশকিল হলো অভিনেত্রী তার নায়ককে যে এক্সপ্রেশন দিচ্ছেন, ভাইকেও সেই এক্সপ্রেশন, দাদুকেও একই এক্সপ্রেশন! ফলে নির্মাতা হিসেবে দর্শকের কাছে সম্পর্কগুলো প্রতিষ্ঠিত করতে আমি বারবার ব্যর্থ হচ্ছিলাম! বারবার শট কাট করতে করতে এক পর্যায়ে মেনে নিতে বাধ্য হলাম, ভাষা একটাই- প্রেম অথবা যৌনতা! আমি আমার টেলিছবির শিরোনামটা বললাম না, কাউকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করা আমার উদ্দেশ্য নয়।

কিশোর বয়সের চরিত্রে যাকে অভিনয় করতে নিয়েছি, তার তো সংলাপ বলতে গিয়ে প্রাণ যায় যায়- বিনয়, বাদল, দীনেশ রাইটার্স বিল্ডিং আক্রমণ করতে যাওয়ার আগমুহূর্তে তাদের অনুভূতি কী ছিল এই বিষয়ক কিছু সংলাপ তাকে দিতে হবে, বিষয়টা সে কোনওভাবেই আত্মস্থ করতে পারছে না! পরে ওর সমস্যা উদঘাটনের জন্য ওকে বললাম, দেখি বলোতো, আরে দোস্ত আইয়া পরিস , মাইয়াটা সেইরকম মাম্মা –সে তোতা পাখির মতো হড়হড় করে সেটা বলে ফেলল, এক্সপ্রেশনও ঠিক ঠাক হলো ! কিন্তু বিনয়, বাদল, দীনেশের মতো স্বদেশী বীরদের নাম উচ্চারণে তার আড়ষ্টতা কোনওভাবেই কাটল না ! হ্যাঁ আমার এক বিদগ্ধ সাংবাদিক বন্ধু ফোন দিয়ে আমাকে বলতে ছাড়লেন না, কাদেরকে যে তুমি কাস্ট করো, হরিবল অ্যাকটিং! আমার বিদগ্ধ বন্ধুটিকে বলতে চাই, আপনি দেখেন, আমি বানাই, বানাতে গিয়ে বুঝি কী সঙ্কটে আছি আমরা! আমারও ২-১ টা হালকা চালের প্রেম-বিরহের নাটক আছে। যেগুলোতে সবার অভিনয় ঠিকঠাক, কারণ দিনের পর দিন সেসবেরই চর্চা করছেন তারা! আর আপনারা ক্রমাগত প্রেম অথবা যৌনতার সুড়সুড়ি মার্কা জিনিসের পৃষ্ঠপোশকতা করতে করতে মানুষকে বুঝিয়ে ছেড়েছেন স্বীকৃতি চাইলে প্রেম অথবা যৌনতা ছাড়া আর কোনও পথ খোলা নেই ।

এই কারণেই পরিচালককে “কিরে মজা লস , অথবা মাম্মা মাইয়াটা সেইরকম”, এই জাতীয় সংলাপ বলাতে একটুও শ্রম দিতে হয় না, নিন্দাও শুনতে হয় না! গত দশ বছর ধরে চোখের সামনে দেখলাম কী করে অভিনয় জিনিসটা ছেলের হাতের মোয়া হয়ে গেল! যাকে যেখান থেকে পারো ধরে এনে বল, তুমি নিজের জীবনযাপনে যেই রকম, ঠিক সেটাই করো! আর বিষয়বস্তুও চেনা- তামাশা অথবা যৌনতা, সুতরাং যে কেউ যেকোনও অবস্থায় অভিনেতা বনে যেতে লাগল ।

নিরীক্ষার জন্য একবার দুইবার এমনটা করা যেতেই পারে , কিন্তু সেটাই যদি নিয়মে পরিণত হয়, অবশিষ্ট থাকে কি! যৌনতা, অশ্লীলতা, বা যে কোনও ধরনের বিকৃতির জন্য চর্চা বা সাধনার দরকার হয় না, কেবলমাত্র ওই মানুষটিকে যথেষ্ট পরিমাণে বিকৃত রুচির হতে হয়। যৌনতাকে আশ্রয় করে কোনও চলচ্চিত্র নির্মিত হলে তথাকথিত প্রগতিশীলরা বলেন মানুষ এবং তার প্রবৃত্তির দ্বন্দ্ব মূর্ত হয়ে উঠেছে, এটাই সমাজের বাস্তবতা! প্রশ্ন হলো আমাদের সামাজিক বাস্তবতা কোনও কালে কেবলমাত্র যৌনতার ওপর ভর করে দাঁড়িয়েছিল! বয়ঃসন্ধিকালে অনেক কিশোরকেই তার শিক্ষিকার প্রতি দুর্বল হতে দেখা যায়, কিন্তু সে জানে এটা প্রকাশ করা যাবে না, তাহলে বকা খেতে হবে । কিন্তু এটা তার প্রবৃত্তির অন্তরালে থেকেই যায়, এটা আমরা জানি , এটা বাস্তবতা তা-ও আমরা জানি । কিন্তু এই বাস্তবতাকে টেনেহিঁচড়ে বের করা কি খুব জরুরি!

মনিকা বেলুচি অভিনীত ম্যালেনা ছবিটি আমরা দেখেছি- সেখানে একজন কিশোর পরিণত বয়েসের একজন রমণীর প্রতি দুর্বল থাকে, স্বপ্নে তার সাথে যৌন মিলনের দৃশ্যও আমরা দেখি। প্রশ্ন হলো ইউরোপের কতটা আমরা নেব? কোনও না কোনও বিশ্বাস, কিংবা আচারের ওপর নিশ্চয়ই আমাদের সংস্কৃতি দাঁড়িয়ে আছে, ইউরোপ নিশ্চয়ই যেকোনো বিষয়ে আমাদের শিক্ষক হতে পারে না! যৌনতা মানুষের অতি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, এটা নিয়ে লম্ফঝম্ফ করা পশ্চিমাদের কাজ, আমরা জাতিগতভাবে অনেক মার্জিত রুচির, সেটা নিয়ে থাকাই স্রেয় । অনেক ফাঁদ সম্পর্কেই আমরা জেনেছি, কেবল বিশ্বায়নের ফাঁদটাই আমাদের চোখে অধরা। সকল মানুষ একই ভঙ্গিতে খাবে, একই ধরনের পোশাক পরবে, হাসবে একইরকম, গাইবে একইরকম, রেস্তোরা, কফিশপ, শপিং মল মিলেমিশে সব একাকার, বিশ্ববাণিজ্যর দীর্ঘ কালো ছায়া গ্রাস করে ফেলবে যেকোনো জনগোষ্ঠীর জাতিগত বৈশিষ্ট্য, তার কৃষ্টি, তার সংস্কৃতি!

বলব না পৃথিবীতে কেবলই মন্দটাই ঘটছে। সর্বকালে- সব সময় ভাল-মন্দ দুই-ই ঘটে পৃথিবীতে, আমরা কোনটা নিচ্ছি সেটাই দেখার বিষয়। আজকেই একটা টিভি চ্যানেলে দেখি একটা ইংরেজি গানের মিউজিক ভিডিও দেখাচ্ছে, সেখানে কেবলমাত্র স্বল্পবসনা কিছু নারীর দাপাদাপি বৈ কোনও সঙ্গীত কানে আসলো না! অথচ গতকালই ইউটিউব এ ডিপ পারপেল-এর সোলজার অফ ফরচুন গানটির অসাধারণ একটা মিউজিক ভিডিও দেখছিলাম । মাত্র দুটি পেরেককে মানুষের আদলে বাঁকিয়ে নিয়ে অসাধারণ নৈপুন্যে মিউজিক ভিডিওটি বানানো হয়েছে, দেখলে আবেগে চোখে জল এসে যায়, এমনি নির্মাণ! আমি হলফ করে বলতে পারি এটি নির্মাণ করতে ২০ হাজার টাকাও খরচ হয়নি! অথচ আমদের দেশের ওই অনুষ্ঠানের নির্মাতার চোখে এই জাতীয় একটা গানের মিউজিক ভিডিও চোখে না পড়ে পড়ল স্বল্পবসনা রমণীদের গানের নামে প্রলাপের মিউজিক ভিডিও!

সুতরাং দৃষ্টিভঙ্গি আর রুচি খুব বড় একটা ব্যাপার। বিশ্বের সাথে যদি তাল মেলাতেই হয়, ভালো জিনিসগুলো খুঁজে বের করাই মঙ্গল। আমাদেরও গর্ব করার মতো অনেক কিছু আছে। আমাদের বাবা-মা জীবনে প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত সন্তানের দেখভাল করেন, আমরা বৃদ্ধ বাবা-মা এর সেবা যত্ন করি । হ্যাঁ আমাদের দেশেও বৃদ্ধাশ্রম আছে, কিন্তু সেটা আমাদের দেশের সামগ্রিক বাস্তবতা নয়, এবং আমাদের প্রচেষ্টা থাকুক সেটা যেন কখনোই আমাদের সামগ্রিক বাস্তবতা হয়ে না ওঠে । আমদের দেশের নির্মাতাদের যদি এতটাই গল্পের আকাল থাকে, আমি বিনে পয়সায় কয়েকটা গল্পের প্লট দিয়ে দেই । কুমিল্লার মোটর কারিগর (নামটা মনে পড়ছে না !) … যে কি-না বিনা জ্বালানিতে ঘণ্টায় ৮৫ কি.মি বেগে চলা গাড়ি আবিষ্কার করে ফেলেছে, ২৫ টাকা মূল্যের একটি কার্বন দণ্ড দিয়ে চলে সেই গাড়ি । কিন্তু সেই গাড়ি নিয়ে কোনও সরকারি অনুমোদন মেলেনি এখনও, কেন মেলেনি, এ প্রশ্নটা নিয়ে কিন্তু দুর্দান্ত একটা চলচ্চিত্র হতে পারে ! কথায় কথায় ভারতকে অনুকরণ করার প্রবণতা যখন আপনার পিছুই ছাড়ছে না, ভারত কিন্তু অলিম্পিকে তাদের

প্রথম সোনা বিজয়ী মিলখাকে নিয়ে ভাগ মিলখা ভাগ বানিয়েছে, আমাদের সাকিব আল হাসানেরও কিন্তু বিশ্বরেকর্ড করা শেষ, আবার তাকে নিয়ে ক্রিকেট বোর্ডের রাজনীতির মারপ্যাঁচও আছে , আছে সাকিব তার স্ত্রীকে উত্যক্তকারীকে কিভাবে মেরে বসে সেই ঘটনা, ক্রিকেট বোর্ড সাকিবকে একগুঁয়ে, বেয়াদব বলে, সুতরাং ওর ক্যারেক্টারাইজেশনও তরুণদের জন্য দেখার মতো হবে। উত্তেজনা, রাজনীতি, প্রেম সব কিছুরই সম্ভাবনা আছে এই গল্পে । খুব সাহস করতে চাইলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়েও চলচ্চিত্র বানানো যায়। এখন সিদ্ধান্ত আপনার।

ব্যতিক্রম নিয়ে ছবি বানাতে হয়, ক্রিকেট এখন বাংলাদেশের বাস্তবতা, সাকিব আল হাসান হলো সেই বাস্তবতার ভেতরের ব্যতিক্রম। যৌনতা, কামনা- বাসনা, লালশা-প্রবৃত্তি এ সব কিছুই মানুষের সহজাত, এই বাস্তবতা যে সকলে কেবলই জানে তাই-ই নয়, জীবনের বিভিন্ন পর্যায় এই বিষয়ক অভিজ্ঞতাও অর্জন করে, এতে ব্যতিক্রম নেই । বাস্তবতার দোহাই ঢের হয়েছে, এবার নতুন কিছু বলুন ।

লেখক: চলচ্চিত্র কর্মী

Leave a comment

XHTML: You can use these html tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>

Comment moderation is enabled. Your comment may take some time to appear.

Show Buttons
Share On Facebook
Share On Twitter
Share On Google Plus
Share On Pinterest
Share On Youtube
Hide Buttons