নিজস্ব প্রতিবেদক | সর্বশেষ আপডেট: সোমবার, 10th নভে., 2014

ইন্টারভিউ // হুমায়ূন আহমেদ

Share This
Tags
Print Friendly

ইন্টারভিউ // হুমায়ূন আহমেদ।।

পত্রপত্রিকা খুললেই আজকাল ইন্টারভিউ নামক একটি ব্যাপার চোখে পড়ে। চিত্রজগতের লোকজনদের সেখানে প্রাধান্য থাকলেও আজকাল ফাঁকে ফোকরে কিছু কবি, নাট্যকার, গল্পলেখক, চিত্রকর ঢুকে পড়েছেন। ইন্টারভিউগুলো সাধারণ দুই ধরনের হয় ১. সহজিয়া ইন্টারভিউ—আপনি কোন রাশির জাতক? আপনার প্রিয় রং কি? আপনার প্রিয় খাবার কি? আপনার হবি কি? আপনি মোহামেডান সাপোর্টার না আবাহনীর? দ্বিতীয় ধরনের ইন্টারভিউ হচ্ছে ২. কঠিনিয়া (বাংলা ব্যাংকরণের ত্রুটি হলে ক্ষমা প্রার্থনা করছি) ইন্টারভিউ। এখানে প্রশ্নকর্তা বেকায়দা অবস্থা সৃষ্টি করার চেষ্টা করেন। বেছে বেছে এমন সব প্রশ্ন করেন যার উত্তর উত্তরদাতার জানার কোনোই কারণ নেই। উদাহরণ দিচ্ছি—মনে করা যাক একজন অভিনেত্রীর সাক্ষাত্কার নেওয়া হচ্ছে। যিনি পড়াশোনার তেমন সুযোগ পাননি। ক্লাস এইট পর্যন্ত উঠে সিনেমায় জড়িয়ে পড়েছেন। প্রশ্নকর্তা তাকে বেকায়দায় ফেলতে চান। সেটা তিনি সাধারণত এভাবে করেন—
প্রশ্ন: আচ্ছা আপা, আপনি তো সাধারণ মানুষ সম্পর্কে ভাবেন তাই না?
উত্তর: (খুবই অবাক) ওমা ভাববো না? আপনি আমাকে কি মনে করেন বাড়ি-গাড়ি করেছি বলেই ওদের কথা ভুলে গেছি? ছিঃ দুঃখি মানুষদের কথা মনে হলেই আমার… (্এইখানে তাঁর গলা প্রায় ধরে গেছে। কথা আটকে যাচ্ছে)।
প্রশ্ন: সমাজ পরিবর্তনের কথা আপনি নিশ্চয়ই ভাবেন?
উত্তর: হুঁ খুব ভাবি।
প্রশ্ন: অবসর সময়ে নিশ্চয়ই এই সমস্যা নিয়ে পড়াশোনাও করেন?
উত্তর: তা করি। পড়াশোনা করতে আমার ভীষণ ভালো লাগে।
প্রশ্ন: দ্য ক্যাপিটাল বইটা তো আপনার নিশ্চয়ই পড়া। তাই না আপা?
উত্তর: হুঁ পড়েছি। খুব ভালো বই।
প্রশ্ন: বইটির লেখকের নাম বলতে পারবেন?
উত্তর: (একটু সময় নিচ্ছেন) আমার ভাই লেখকের নাম মনে থাকে না। বইয়ের ঘটনা মনে থাকে। লেখকের নামটা তো বড় নয়। বইটাই বড় তাই না ভাই?
প্রশ্ন: তা তো নিশ্চয়ই। ক্যাপিটাল বইটির ঘটনা মনে আছে আপনার?
উত্তর: অনেক দিন আগে পড়েছি তো পুরোপুরি মনে নেই। তবে বইটা খুবই দুঃখের। লাস্ট সিনে মেয়েটা বোধহয় মারা যায় তাই না?
এখানে যা লক্ষণীয় তা হচ্ছে প্রশ্নকর্তা ফাঁদে ফেলবার জন্যে কি ভাবে এগুচ্ছেন? এবং উত্তরদাতা কত সহজে ফাঁদে পা দিচ্ছেন। সিনেমার নায়িকা নিয়ে উদাহরণ না দিয়ে আমি একটি বাস্তব উদাহরণ দিচ্ছি। এবারের উত্তরদাতা একজন রাজনীতিবিদ। শিল্প-সাহিত্য সংস্কৃতি নিয়ে এরা চিন্তাভাবনা এবং পড়াশোনা করেন বলে অনেকেই মনে করেন। তাঁকে প্রশ্ন করা হলো তাঁর প্রিয় ঔপন্যাসিক কে? তিনি একটি নাম বললেন। নামটি কার তা বলছি না তবে বুদ্ধিমান পাঠক নিশ্চয়ই আঁচ করতে পারছেন। যারা পারছেন না তারা সম্ভবত আমার কোনো বই পড়েননি। হা হা হা।
যাই হোক নামটি বলেই তিনি কিন্তু ফাঁদে পা দিলেন।
প্রশ্ন: তার কি কি বই পড়েছেন?
উত্তর: অনেকগুলো পড়েছি। নাম মনে করতে পারছি না।
প্রশ্ন: কোনো একটি উপন্যাসের ঘটনা যদি বলেন তাহলে নামটি মনে করবার ব্যাপারে সাহায্য করতে পারি। কোনো ঘটনা মনে আছে?
উত্তর: জি না।
প্রশ্ন: আপনার প্রিয় ঔপন্যাসিক অথচ আপনি তাঁর কোনো বইয়ের নাম জানেন না। ঘটনা বলতে পারছেন না ব্যাপারটা কি?
রাজনীতিবিদ নিরুত্তর। ইন্টারভিউটি ছাপা হয়েছিল বিচিত্রা কিংবা আনন্দ বিচিত্রায় আমার ঠিক মনে পড়ছে না। আমাদের সবচে’ বড় দুর্বলতা হচ্ছে আমরা কোনো জিনিস সম্পর্কে অজ্ঞ ঐটি স্বীকার করতে চাই না। প্রশ্নকর্তা আমাদের এই দুর্বলতাকে চমত্কার ব্যবহার করেন। সুন্দর ফাঁদ পাতেন। অজান্তে সেই ফাঁদে পা দেই তারপর আর বেরুবার পথ থাকে না।
অবশ্যি ঠিকঠাক উত্তর দিয়েও অনেক সময় পার পাওয়া যায় না। প্রশ্নকর্তা উত্তরগুলো নিজের মতো করে সাজান। উত্তর যেমন আছে তেমনি রাখেন কিছুই বদলান না কিন্তু সাজানোর কারণে সম্পূর্ণ উল্টে যায়। উদাহরণ দেই। মনে করা যাক, একজন সাংবাদিক নামী এক চিত্র তারকার ইন্টারভিউ নিতে গেছেন। অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল ছয়টায় নায়িকা এলেন রাত নয়টায়। এসেই আবার ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। নানান জায়গায় টেলিফোন করতে লাগলেন। এক ফাঁকে শুধু বললেন, কিছু মনে করবেন না খুব ব্যস্ত। আপনাকে কিছু খেতে দিয়েছে? দেয়নি? ওমা কি কাণ্ড। কি খাবেন?
সাংবাদিক মহাবিরক্ত হয়ে বললেন, এক গ্লাস পানি খাব।
নায়িকা এক গ্লাস পানি টেবিলে রেখে উধাও হয়ে গেলেন। এখন সাংবাদিক ভদ্রলোক রিপোর্ট কি কি ভাবে লিখবেন? দুভাবে লিখতে পারেন।
নমুনা-১ [ভালো রিপোর্ট]
মিস ‘অ’র সঙ্গে আমার দেখা করার কথা সন্ধ্যা ছয়টায়। আমি জানতাম আন্তরিক ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তিনি তা রক্ষা করতে পারবেন না। কারণ তাঁর ব্যস্ততার সীমা নেই। আমাকে তিনি সময় দিয়েছেন শুধুমাত্র এই কারণে যে কাউকে তিনি না করতে পারেন না। যা ভেবেছি তাই তিনি আসতে পারলেন না। আমি বসে বসে তাঁর বসার ঘর লক্ষ্য করলাম। স্নিগ্ধ রুচির ছোঁয়া চারপাশে। দেখতে ভালো লাগে। পবিত্র কাবা শরিফের একটি বাঁধানো ছবি ঘরে আছে। আধুনিকতার নামে তিনি ধর্ম বিশ্বাসকে দূরে সরিয়ে রাখেননি। উনি এলেন রাত নয়টায়। আমাকে দীর্ঘ সময় বসে থাকতে দেখে লজ্জায় তাঁর অপরূপ মুখশ্রী রক্তবর্ণ হয়ে গেল। কিন্তু তিনি যে আমার সঙ্গে কথা বলবেন সেই সময় কোথায় একের পর এক টেলিফোন আসছে। তবু এর ফাঁকেও যখন শুনলেন আমি তৃষ্ণার্ত তিনি ছুটে গিয়ে নিজের হাতে এক গ্লাস বরফ শীতল পানি নিয়ে এলেন। আমি তাঁর সৌজন্য ও ভদ্রতায় মোহিত হলাম।
নমুনা-২ [মন্দ রিপোর্ট]
এ দেশে কিছু কিছু তারকা (!) আছেন যারা মনে করেন অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিয়ে উপস্থিত না হওয়াটা তাদের তারকামূল্যের মাপকাঠি। যিনি যত বড় তারকা তিনি তত দেরি করবেন। মিস ‘অ’ হচ্ছেন এমন একজন। সন্ধ্যা ছয়টায় অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে আমি রাত নয়টা পর্যন্ত বসে রইলাম। মশার কামড় খেতে খেতে মিস ‘অ’র রুচিহীন গৃহসজ্জা দেখে সময় কাটানো ছাড়া আমার কিছু করার নেই। দেয়ালে কামরুল হাসানের তরুণীর পেইন্টিং-এর পাশাপাশি কাবা শরিফের বাঁধাই ছবি। শো কেসে দামি বিদেশি ডলের পাশে বঙ্গ সংস্কৃতি পরাকাষ্ঠা হিসেবে একটি তালের হাতপাখা। উঠতি ধনীদের মতো যেখানে যত দামি জিনিস পেয়েছেন মিস ‘অ’ তার সবই বসার ঘরে জড়ো করেছেন।
যাই হোক মিস ‘অ’র এক সময় মর্জি হলো তিনি এলেন এবং তিনি যে অসম্ভব ব্যস্ত তা প্রমাণ করবার জন্যে একটির পর একটি টেলিফোন করতে লাগলেন। আমি দীর্ঘ সময় তাঁর জন্যে বসে আছি জেনে তিনি অবশ্যি করুণাবশত আধ গ্লাস ঠান্ডা পানি আমার সামনে রেখে গেছেন। আমি মনে মনে বললাম, হে বঙ্গ ভাণ্ডারে তবে বিবিধ রতন…
তবে এই সমস্ত রিপোর্টারদের বেকায়দায় ফেলারও উপায় আছে। আমি কয়েকবার ফেলেছি। একটি উদাহরণ দিচ্ছি। বছরখানেক আগে আমার ইন্টারভিউ নিতে এক রিপোর্টার এলেন। তাঁর ভাবভঙ্গি দেখেই বুঝলাম অবস্থা ভালো না। এই লোক এসেছে আমাকে বেকায়দায় ঠেলে ফেলবার জন্যে। কাজেই আমি উত্তরের ধরন পাল্টে দিলাম। নমুনা দিচ্ছি—
প্রশ্ন: আচ্ছা আপনি কি স্বীকার করেন এ পর্যন্ত যা লিখেছেন সবই বাজে মাল?
উত্তর: কেন স্বীকার করব না। এটা তো লুকিয়ে রাখার কোনো ব্যাপার না। সবই রদ্দি জিনিস। পচা মাল।
প্রশ্ন: আপনার লেখাগুলো কিন্তু বেশির ভাগই হালকা।
উত্তর: কারেক্ট। তবে আপনি বোধ হয় ভদ্রতা করে বলছেন বেশির ভাগই হালকা। আসলে সবই হালকা। আপনি যেমন জানেন আমিও জানি। অন্যরাও জানে। পুরনো কথা তুলে কি লাভ?
প্রশ্ন: জীবন সম্পর্কে আপনার কোনো বোধ নেই।
উত্তর: খুবই সত্যি কথা।
প্রশ্ন: নাট্যকার হিসেবেও আপনি ব্যর্থ। কারণ এখন পর্যন্ত কোনো নাটকে সমাজের প্রতি কোনো কমিটমেন্ট আপনি দেখাতে পারেননি।
উত্তর: একশ ভাগ খাঁটি কথা। আমার নাটক মানেই ফালতু বিনোদন।
ভদ্রলোক যা বলেন আমি তাতেই রাজি হয়ে যাই। ইন্টারভিউ আর কিছুতেই জমে না। এক সময় তাঁকে মুখ কালো করে উঠে পড়তে হয়। উঠতে উঠতে তিনি বলেন, আপনার এই সাক্ষাত্কার ছাপার কোনো মানে হয় না। কেউ ইন্টারেস্ট পাবে না। এটা ছাপা হবে না।

হুমায়ূন আহমেদ-এর ’(১৯৪৮–২০১২) ‘এলেবেলে প্রখম খন্ড থেকে ঈষৎ সংক্ষেপিত 

Leave a comment

XHTML: You can use these html tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>

Comment moderation is enabled. Your comment may take some time to appear.

Show Buttons
Share On Facebook
Share On Twitter
Share On Google Plus
Share On Pinterest
Share On Youtube
Hide Buttons